
🌐 নিউজ ডেস্ক | বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম |
আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ে করতে সালিশ পরিষদের অনুমতি লাগে। রিট আবেদনকারী চেয়েছিলেন, স্বামীরদ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হোক।
দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর বদলে সালিশ পরিষদের অনুমতির যে বিধান মুসলিম পারিবারিক আইনেরয়েছে, তা বৈধতা পেয়েছে হাই কোর্টের এক রায়ে।
ওই বিধান চ্যালেঞ্জ করে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়ার বিধান চেয়ে চার বছর আগে রিট মামলা করেছিলেন সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী। সেই আবেদন খারিজ করে রায় দিয়েছে হাই কোর্ট।
বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের বেঞ্চ গতবছর অগাস্টে এ রায় দেয়। ডিসেম্বরেপূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে।

এর ফলে দ্বিতীয় বিয়ে করতে সালিশ পরিষদ বা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির বিধানই বহাল থাকছে বলেরিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছেন।
হাই কোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন তিনি।
আইন কী বলছে?
ব্রিটিশ আমলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় বলা ছিল, স্ত্রী বা স্বামীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলেসাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হবে।
পরে পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়। সেখানেবহুবিবাহের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ স্পষ্ট করা হয়।
এ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তির একটি বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় সালিশ পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া পুনরায়বিয়ে করতে পারবেন না এবং এরকম অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে সম্পন্ন হলে তা রেজিস্ট্রি করা যাবে না।

এক বা একাধিক স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরো বিয়ে করতে হলে সালিশ পরিষদের অনুমতি নিতে হবে। সেজন্যনির্ধারিত ফি দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে চেয়ারম্যানের (বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের মধ্যে শেষ স্ত্রীর এলাকার ইউনিয়নপরিষদের চেয়ারম্যান) কাছে আবেদন করতে হবে। এবং আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ, প্রয়োজনীয়তাএবং এ বিয়ের বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি আছে কিনা তা লিখতে হবে।
আবেদনপত্র পাওয়ার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তাদের নিজ নিজ প্রতিনিধিমনোনয়ন করতে বলবেন এবং এ সালিশ পরিষদ যদি মনে করে যে, প্রস্তাবিত বিয়েটি প্রয়োজন ও ন্যায়সঙ্গত, তাহলে এবং কোনো শর্ত থাকলে তা সাপেক্ষে, পরবর্তী বিয়ের অনুমতি দিতে পারবে।
আবেদনপত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সালিশ পরিষদ তার সিদ্ধান্তের কারণগুলো লিপিবদ্ধ করবে।কোনো পক্ষ নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট মহকুমা হাকিমের কাছে পুনর্বিচারের আবেদনকরতে পারবে এবং মহকুমা হাকিমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এর বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্নউত্থাপন করা যাবে না।
কোনো পুরুষ সালিশ পরিষদের অনুমতি ছাড়া যদি আরও একটি বিয়ে করেন, তাহলে তাকে (ক) অবিলম্বে তারবর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সমস্ত দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে। পরিশোধ করা না হলে তা বকেয়া রাজস্বেরমত আদায় করা যাবে; (খ) অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডঅথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
হাই কোর্ট কী সিদ্ধান্ত দিল
আইনজীবী ইশরাত হাসান ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে এই রিট মামলাকরেন।
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা কেন অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সেই মর্মে রুল চাওয়া হয় সেখানে।
পরে তিনি একটি সম্পূরক আবেদন দাখিল করে প্রার্থিত রুলের ভাষায় পরিবর্তন আনেন।
একটি রুল নিসি জারি করা হোক, যাতে প্রতিপক্ষদের দেখাতে বলা হয়—
বিদ্যমান বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের অনুমতি প্রদানের বর্তমান পদ্ধতি/প্রক্রিয়া, যাস্ত্রীদের মধ্যে সমান অধিকার নিশ্চিত করে না, তা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থি হওয়ায় কেন আইনগতকর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের পারিবারিক জীবনের অধিকতর সুরক্ষারস্বার্থে বহুবিবাহ আইন সংক্রান্ত বিষয়ে কেন নীতিমালা করা হবে না, সেই মর্মে রুল চাওয়া হয় সেখানে।
এর মধ্য দিয়ে কার্যত মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়টিকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়।
হাই কোর্ট সে সময় প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল জারি করে। সেই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতবছর রায়ঘোষণা করা হয়।
মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন থেকে উদ্ধৃত করে রায়ে বলা হয়, “এতে দেখা যায়, ইসলামী আইনবহুবিবাহের অনুমতি দিলেও, যেখানে কোনো পুরুষ দুই বা ততোধিক স্ত্রীর অধিকার ন্যায়সঙ্গতভাবে পালন করতেঅক্ষম হওয়ার আশঙ্কা করেন, সেখানে ‘একজনকেই বিবাহ করার’ বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশকে বিশেষভাবে গুরুত্বদেওয়া হয়েছে। এ কারণে ইসলামী আইনশাস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (ইজতিহাদ বা স্বাধীন আইনগতব্যাখ্যার মাধ্যমে) মত দিয়েছেন যে, অধিকাংশ পরিস্থিতিতে একজন পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ থেকে বিরতথাকাই উত্তম।
বাংলাদেশে প্রযোজ্য হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত; তবে তা নির্ভরশীল একজনপুরুষের ন্যায়পরায়ণতা ও একাধিক স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়ার আর্থিক সক্ষমতার ওপর।”
সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আদালত বলেছে, বাংলাদেশে বহুবিবাহ সংক্রান্ত বিষয়টি নিম্নরূপে সংক্ষেপেউপস্থাপন করা যেতে পারে–
অনুমোদনযোগ্যতা: ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত এবং হানাফি মাজহাব এটিকে একটি বৈধ প্রথা হিসেবেস্বীকৃতি দেয়।
• মূল শর্ত: এই প্রথা তখনই অনুমোদিত, যখন স্বামী একাধিক স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার করতে সক্ষম হন এবং তাদেরভরণপোষণের জন্য আর্থিকভাবে সক্ষম থাকেন।
• ন্যায়বিচারের বাধ্যবাধকতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ন্যায়পরায়ণ হওয়ার সক্ষমতা, যার মধ্যে সময়, উপহার এবং অন্যান্য বস্তুগত বিষয়ে সমান আচরণ নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত।
যখন সুপারিশযোগ্য নয়: যদি কোনো পুরুষ আশঙ্কা করেন যে তিনি ন্যায়বিচার করতে পারবেন না, তবে তারউচিত বহুবিবাহ থেকে বিরত থাকা এবং এক স্ত্রীর মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকা; কারণ এটিই আদর্শ ও উত্তম বিকল্প।
১৯৯৭ সালে হাই কোর্টের দেওয়া আরেক রায়ে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১–এর ৬ ধারা বাতিলকরে ‘ইসলামী আইনের নীতির পরিপন্থি’ হওয়ায় বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার জন্য একটি নতুন বিধান প্রতিস্থাপনেরসুপারিশ করা হয়েছিল।
তবে ওই সুপারিশের পরও সরকার যে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, সে বিষয়টি তুলে ধরে বিচারপতি ফাহমিদাকাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের বেঞ্চ তাদের রায়ে বলেছে, “উপরোক্ত পর্যবেক্ষণের আলোকেসরকার যদি একটি ফোরাম গঠন করে— হয় ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বহুবিবাহ অনুমোদনের জন্য, অথবা হাইকোর্ট বিভাগের সুপারিশ অনুযায়ী বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার জন্য— তাহলে বাংলাদেশে বহুবিবাহ সংক্রান্ত সববিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।”
রায়ে হাই কোর্ট বলেছে, “এটি স্পষ্ট যে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১–এর ৬ ধারার অধীনেআরেকটি বিবাহের অনুমতি প্রদানের প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয়। এই আইন কোনোপক্ষের (পুরুষ ও নারী উভয়ের) অধিকার খর্ব করে না বা কেড়ে নেয় না; একই সঙ্গে এটি সালিশ পরিষদের জন্যবহুবিবাহের অনুমতি প্রদান বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতাও আরোপ করে না।
“সালিশ পরিষদ বিবাহের কোনো পক্ষের ওপর একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।”
আদালত বলেছে, “সুতরাং আমরা সংবিধানের প্রস্তাবনায় বর্ণিত সমতা ও ন্যায়বিচারের নীতি কিংবা সংবিধানের২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত সমতা ও বৈষম্যবিরোধী বিধানের আলোকে কোনো সাংবিধানিক বৈষম্য খুঁজে পাইনা। বরং এই বিধানটি সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদের পরিপূরক, যেখানে আইনের অধীন ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদেওয়া হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে, ধর্ম পালন, চর্চা ও প্রচারের অধিকার আইন দ্বারা কেড়ে নেওয়া যেতে পারে; বরং এর অর্থহল— সংসদ আইন দ্বারা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ, চর্চা ও প্রচারের পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”

রায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে হাই কোর্ট বলেছে, “উপরোক্ত কারণ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পরিপূর্ণ মতহল, বহুবিবাহের অনুমতি দিতে গিয়ে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১–এর ৬ ধারা বাংলাদেশেরনারী নাগরিকদের কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না। তাই এ রুলের পক্ষে উত্থাপিত যুক্তির কোনো ভিত্তিনেই। রুলটি খারিজ করা হল।”
যা বলছেন আইনজীবী
আইনজীবী ইশরাত হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইনঅধ্যাদেশে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য সালিশ পরিষদে আবেদন করার ক্ষেত্রে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদেরসম্মতি নেওয়া হয়েছেকিনা, তা উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, সেখানে বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
“সাধারণভাবে বহুল প্রচারিত ধারণা হল, দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে। কিন্তুবাস্তবতা হল, ওই আইনে তা বলা হয়নি। অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে সালিশ পরিষদের ওপর।কিন্তু পরিষদ তো প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কীসের ভিত্তিতে কী কারণে পরিষদ দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতিদেবে, সেসব বিষয়ও আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়নি।”
ইশরাত হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির মত একটা বিষয়কেআরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর রেখে দেওয়াকে চ্যালেঞ্জ করে আমি রিট আবেদন করেছিলাম। আবেদন ছিল, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে করতে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে।
“রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল দিয়েছিল আদালত। রুল শুনানির পর গত অগাস্টে আদালত তা খারিজ করেদিয়েছে। ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে।”
এর ফলে মুসলিম পরিবার আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর বর্তমান বিধানই বহাল রইল জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরাএর বিরুদ্ধে আপিল করব।
আরও পড়ুন …
সংবাদটি শেয়ার করুন
মতামত দিন ।


















