স্টাফ রিপোর্টার | একসময় লোকে বলত ‘পাগলাটে স্বপ্ন’। কেউ হাসত, কেউবা করত বিদ্রূপ। কিন্তু সেই অসম্ভবকে সম্ভব করাই যার নেশা, তিনি শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের অধীনে উত্তরার দিয়াবাড়িতে গড়ে উঠছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ— যেখানে ব্যক্তিগত মুনাফা নেই, আছে কেবল মানুষের কল্যাণ। সম্প্রতি এই মেগা প্রকল্পগুলো পরিদর্শনে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস আবারও মনে করিয়ে দিলেন, “সাহস থাকলে আকাশছোঁয়া স্বপ্নও সত্যি হয়।”
সেবার নতুন দিগন্ত: সামাজিক হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ
দিয়াবাড়ির বিশাল এলাকাজুড়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে ৭০০ শয্যার সামাজিক হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং স্বাস্থ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্মাণকাজ। ভবিষ্যতে এটি ১০০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়, বরং বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অনেক স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রকল্পের অংশীদার হতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ দিচ্ছে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’
আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে উদ্যোক্তা তৈরির বিশেষ বিদ্যাপীঠ ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’। বর্তমানে গ্রামীণ ক্যালেডোনিয়ান কলেজ অফ নার্সিং (GCCN) ক্যাম্পাসে এর দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অধ্যাপক ইউনূস স্পষ্ট করেই বলেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য গতানুগতিক করপোরেট মুনাফা বা চাকরির পেছনে ছোটা নয়। বরং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলা, যাতে তারা অন্যের অধীনে কাজ না করে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের নার্স: ৫ বছরে লক্ষ্য ১ লাখ
পরিদর্শনকালে নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশে দক্ষ নার্স ও কেয়ারগিভারদের বিশ্বজুড়ে বিশাল চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে জাপানের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সেবায় বাংলাদেশের তরুণদের বিশাল সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, আগামী ৫ বছরে ১ লক্ষ দক্ষ পেশাদারকে জাপানে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তার সরকার।
ব্যক্তিগত মুনাফাকে ‘ডিলিট’ করেছি
এক জনাকীর্ণ মিলনায়তনে নিজের দর্শনের কথা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, “আমরা ব্যক্তিগত মুনাফার ধারণাটিকেই ডিলিট (মুছে ফেলা) করে দিয়েছি।” তিনি জানান, ল্যাট্রিন তৈরি কিংবা চার খুঁটির টিনের ঘর বানানোর যে স্বপ্ন একসময় মানুষ ‘পাগলামি’ ভাবত, আজ তা বিশাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রূপ নিয়েছে। এখানে কোনো বাণিজ্যিক বা স্বার্থপর উদ্দেশ্য নেই; প্রতিটি প্রচেষ্টাই নিবেদিত মানুষের কল্যাণে।
তিন শূন্যের পৃথিবী: আগামীর স্বপ্ন
অধ্যাপক ইউনূস আবারও তার কালজয়ী ‘থ্রি জিরো’ বা তিন শূন্যের দর্শনের ওপর জোর দেন— শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ, দারিদ্র্য বিমোচনে শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে শূন্য বেকারত্ব। এই দর্শনই হবে বাংলাদেশের আগামীর চালিকাশক্তি।
অনুষ্ঠানে গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্ট, ইউনূস সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, স্থপতি ও প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন। দিয়াবাড়ির এই তিলোত্তমা প্রকল্পগুলো কেবল ইট-পাথরের দালান নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের এক জীবন্ত মানচিত্র হয়ে উঠছে।
আরও জানতে চোখ রাখুন…


















