
লেখক:
মো. রিয়াজুল সোহাগ
নির্বাহী সম্পাদক ও কলামিস্ট
একটি রাষ্ট্র যখন গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যায়, তখন ‘সংস্কার’ শব্দটি শুনতে খুব আরামদায়ক মনে হয়। মনে হয় যেন এক জাদুমন্ত্রে সব জরাজীর্ণতা ধুয়ে মুছে যাবে। কিন্তু সেই সংস্কার যদি কেবল সংবিধানের ধারা-উপধারা আর দাড়ি-কমার কাটাছেঁড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জাতির জন্য আশার বদলে আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সময়ে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের যে দীর্ঘমেয়াদি আলাপ আমরা দেখছি, তা কি সত্যিই জনকল্যাণের জন্য, নাকি এটি কেবলই সময়ের অপচয়?
তত্ত্বের বিলাসিতা বনাম পেটের ক্ষুধা
সংবিধান একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে আইনের ধারাগুলোর চেয়ে একমুঠো চালের দাম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন বাজার সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ মানুষ জিম্মি, যখন কর্মসংস্থানের অভাব তরুণ সমাজকে দিশেহারা করে তুলছে, তখন সংবিধানের পাতা ওল্টানো কি কিছুটা ‘তাত্ত্বিক বিলাসিতা’ নয়? সংস্কারের নামে যে দীর্ঘ সময়টি আমরা ব্যয় করছি, সেই সময়ে প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে পারলে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হতো।
আলোচনার বৃত্তে বন্দি ভবিষ্যৎ
আমরা দেখছি একের পর এক কমিশন গঠন, সংলাপ আর সেমিনারের মহোৎসব। প্রশ্ন জাগে, এই আলোচনার শেষ কোথায়? ইতিহাস বলে, অতি-আলোচনা অনেক সময় মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সংস্কারের এই দীর্ঘসূত্রতা জনগণের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি ও অনীহা তৈরি করছে। মানুষ চায় দৃশ্যমান পরিবর্তন—যা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, দুর্নীতি কমাবে এবং সুশাসন আনবে। অথচ আমরা আটকে আছি ‘শব্দ পরিবর্তনের’ গোলকধাঁধায়।
অগ্রাধিকারের সংকট
একটি রাষ্ট্রের জন্য সব কাজই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সব কাজ একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করাটাই হলো নেতৃত্বের মুন্সিয়ানা। আজ যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলা সবচেয়ে জরুরি ছিল, তখন সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি কেন প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল? সংবিধান সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া হতে পারে, এর জন্য কি রাষ্ট্রের সব চালিকাশক্তিকে এক জায়গায় স্থবির করে রাখা সমীচীন?
জনআকাঙ্ক্ষার অপমৃত্যু
মানুষ রাজপথে নেমেছিল বৈষম্যহীন এক সমাজের আশায়, যেখানে বিচার পাওয়া সহজ হবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে। এই পরিবর্তনগুলো আনার জন্য বর্তমান সংবিধানের ভেতরে থেকেও অনেক কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। কিন্তু আমরা কাঠামোগত পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে মৌলিক কাজগুলো পিছিয়ে দিচ্ছি। সময়ের এই অপচয় শেষ পর্যন্ত এক গভীর শূন্যতা তৈরি করতে পারে, যা পূরণ করা ভবিষ্যতে কঠিন হয়ে পড়বে।
শেষ কথা
মনে রাখা প্রয়োজন, সংবিধান মানুষের জন্য, মানুষ সংবিধানের জন্য নয়। কাগজের আইন পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের গতি যদি ধীর হয়, তবে সেই সংস্কার জনগণের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। সময় বয়ে যাচ্ছে দ্রুত—এখন আর বিতর্কের টেবিলে বসে থাকার সময় নেই, এখন সময় কাজের। সংস্কার যেন কোনোভাবেই সময়ের অপচয়ের অজুহাত না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
আরও জানতে চোখ রাখুন…
















