
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের, ব্যুরো চীফ নোয়াখালী:
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বিজয়নগর গ্রামের প্রায় ৬০ বছর বয়সী জাহানারা বেগমের সংসারে এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। একমাত্র ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুলকে ঘিরেই ছিল তার সব স্বপ্ন, নির্ভরতা আর বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু ইতালির রাজধানী রোমে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের মেয়েসহ নিহত হয়েছেন বাবুল। অথচ বৃদ্ধা মায়ের কাছে এখনো সেই নির্মম সত্যটি গোপন রাখা হয়েছে।
শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে বাবুলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। ঘরের এক কোণে বসে বিলাপ করছেন জাহানারা বেগম। চোখের পানি মুছতে মুছতে বারবার বলছেন, “আমার বাবুল আবার আইবো, আমার বাবুল কিছু হইব না।”
তার এই আকুতি শুনে উপস্থিত স্বজন ও প্রতিবেশীরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা জানান, জাহানারা বেগমের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এখনো তাকে ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, বাবুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে ইতালির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে জীবিকার সন্ধানে ফুফাতো বোনের জামাই আমিন উল্যার সহায়তায় ইতালিতে পাড়ি জমান কামাল উদ্দিন বাবুল। বিদেশ যাওয়ার আগে পারিবারিকভাবে একই ইউনিয়নের মমতাজ বেগম আরজুকে বিয়ে করেন। পরে তাদের সংসারে জন্ম নেয় ছেলে অয়ন ও মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সংগ্রামে ইতালিতে গড়ে ওঠে তাদের সুখের সংসার। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, কয়েক বছর পর দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন বাবুল। কিন্তু সেই স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে যায়।
ইতালির স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তির ভিয়া মন্তিলিও এলাকায় নৃশংস হামলায় নিহত হন কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং পাঁচ বছর বয়সী কন্যা আরোয়া ইসলাম আরিশা। গুরুতর আহত হয় তাদের ছেলে অয়ন, যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বজনদের দাবি, একই গ্রামের শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বাবুলের স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জের ধরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে থাকাকালীন সময় থেকেই বিষয়টি নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ছিল। পরে স্ত্রী-সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান বাবুল। অন্যদিকে শাহাদাত কয়েক বছর যুক্তরাজ্যে থাকার পর ইতালিতে যান।
ঘটনার দিন বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে উভয়পক্ষের মধ্যে বৈঠক চলাকালে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে শাহাদাত ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালান বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বাবুল, তার স্ত্রী ও শিশু কন্যা। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে গিয়ে রক্ষা পায় ছেলে অয়ন।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর সন্দেহভাজন শাহাদাত তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রহস্যজনক স্ট্যাটাস দেন। সেখানে লেখা ছিল, “একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।”
শনিবার ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহাদাত হোসেনের ছবি প্রকাশ করে তাকে ট্রিপল মার্ডার মামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানায়।
শাহাদাতের বড় ভাই, সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, “চার বছর আগে শাহাদাত পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না।”
নিহত বাবুলের বাবা সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রায় এক বছর আগে তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দিয়ে একটি উড়ো চিঠি পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি মৌখিকভাবে কোম্পানীগঞ্জ থানাকে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। “তখন ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু কখনো ভাবিনি আমার ছেলেকে এভাবে হারাতে হবে,” বলেন তিনি।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, “তৎকালীন সময়ে ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিল।”
এদিকে ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, শুক্রবার রাতে পার্ক এলাকা থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
চরকাঁকড়ার সেই বাড়িটিতে এখন শুধু কান্না আর অপেক্ষা। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি—এখনো জানেন না মা জাহানারা বেগম, যার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন, সেই বাবুল আর কোনোদিন ফিরে এসে বলবে না, “মা, আমি আইছি।”
আরও পড়ুন…
















