
**কুমিল্লা প্রতিনিধি:
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বড় ধরনের মোড় নিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সেনাবাহিনীর সাবেক দুই সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন কুমিল্লার একটি আদালত। একই সঙ্গে আসামিরা সুকৌশলে দেশের বাইরে পালিয়ে থাকায় তাদের গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারি করার জোরালো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৮ই জুন) বিকেলে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এর বিচারক মুমিনুল হক এই যুগান্তকারী আদেশ দেন। কুমিল্লার সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. কাইমুল হক রিংকু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া সাবেক দুই সেনাসদস্য হলেন— তৎকালীন কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ (বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের গড়ঘাটা এলাকার বাসিন্দা) এবং সৈনিক শাহীন আলম (কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা)।
আদালত ও মামলা সূত্র জানায়, সম্প্রতি মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম কুমিল্লার আদালতে সন্দেহভাজন এই দুই সাবেক সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশনা চেয়ে একটি বিশেষ আবেদন করেন। একই আবেদনে তনু হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সেনাবাহিনীর নিজস্ব নথিপত্রে তদন্তসংশ্লিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্য থাকলে, সেটি মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে পিবিআই কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করারও অনুরোধ জানান। গতকাল মামলাটির পূর্বনির্ধারিত ধার্য তারিখে বিজ্ঞ আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করে এই আদেশ দেন।
হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ সময় পর নতুন এই অগ্রগতির বিষয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তনু হত্যা মামলার বৈজ্ঞানিক তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনার পর তনুর ব্যবহৃত পোশাক থেকে উদ্ধার করা ফরেনসিক নমুনায় নতুন করে আরেকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষায় তনুর পোশাকে মোট চারজনের ডিএনএ প্রোফাইল বা নমুনা মিলল। সিআইডির আগের পরীক্ষায় তিনজনের শুক্রাণু (স্পার্ম) পাওয়ার তথ্য সামনে এলেও, পিবিআইয়ের নতুন রাসায়নিক পরীক্ষায় চতুর্থ আরেক ব্যক্তির রক্তের অকাট্য নমুনা মিলেছে তনুর পোশাকে, যা তদন্তে বড় ধরনের টার্নিং পয়েন্ট এনে দিয়েছে।
এদিকে, তনু হত্যা মামলায় ইতিপূর্বে গ্রেপ্তার হওয়া অন্যতম মূল সন্দেহভাজন ও সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গতকাল কড়া নিরাপত্তায় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাঁকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গত এপ্রিল মাসে ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে পিবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে তিনি কারান্তরীণ রয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০শে মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরদিন সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে একটি জঙ্গল থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে থানা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডি মামলাটি তদন্ত করলেও কোনো কিনারা করতে পারেনি। পরবর্তীতে ২০২০ সালে মামলাটি পিবিআইতে হস্তান্তরের পর ডিএনএ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে একের পর এক চাঞ্চল্যকর সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
আরও জানতে চোখ রাখুন…
















