
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামীর খোন্দকারাবাদে বুধবার সন্ধ্যায় চলছিল সংসদনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগ। মুহুর্মুহু স্লোগানের মধ্যেইআচকা গুলি। টার্গেট আলোচিত ‘সন্ত্রাসী’ সরওয়ার হোসেন বাবলা। ৭ পয়েন্ট ৬২ বোরের পিস্তল তাঁর ঘাড়ে ঠেকিয়ে গুলি চালান একজন। তিনটি গুলির পর মাটিতেলুটিয়ে পড়েন বাবলা। ভিডিও ফুটেজ দেখে কে গুলি চালিয়েছে তা জানাতে নাপারলেও এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্বে যে রায়হান–ইমন জুটি ছিল– সেটা নিশ্চিত করেছেনপুলিশ ও তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত ১৪ মাসে এই জুটির বিরুদ্ধে বাবলাসহ ৯টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগরয়েছে। তবু পুলিশ তাদের টিকিও ছুঁতে পারেনি। এদিকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেওকাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ, হয়নি মামলাও। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এলাকার নির্মাণাধীন ভবনে ইট–বালু সরবরাহ, বালুমহাল ও প্লট ভরাটের নিয়ন্ত্রণনিয়েই এই হত্যাকাণ্ড।
বাবলা হত্যায় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যাদের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী নিশ্চিত হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ–পূর্ব রাউজানের বদিউল আলমেরছেলে রায়হান (৩৫), ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর গ্রামের মোহাম্মদ মুসার ছেলে মোবারক হোসেন ইমন (২২), নগরের খুলশী সিডিএ পুনর্বাসন এলাকার খায়রুল আলমের ছেলেবোরহান (২৭) ও রাউজানের পরীর দীঘির পাড়ের আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. খোরশেদ (৪৫)। পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, চারজনই গুলি চালাতে সিদ্ধহস্ত।তারা কারাগারে থাকা সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের অনুসারী। ছোট সাজ্জাদবিদেশে পালিয়ে থাকা আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) হাসিব আজিজ বলেন, হত্যায়জড়িতদের সঙ্গে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ রয়েছে। অনেক দুর্গম এলাকায় তাদেরআস্তানা।
আমরা সেখানেও অভিযান চালিয়েছি। তবে সেখানে তাদের খুঁজে পাওয়া দুরূহব্যাপার। তারা মোটরসাইকেলে এসে ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত চলে যায়। একই কথাজানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সান্তুও।
স্থানীয় সূত্র ও তদন্ত–সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম–৮আসনের প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ জনসংযোগে যাবেন এ তথ্যআগেই ছিল হত্যাকারীদের কাছে। বুধবার বিকেলে এরশাদ উল্লাহ খোন্দকারাবাদেজনসংযোগ শুরু করেন। বাবলার বাড়ির পাশে হযরত ইজ্জত উল্লাহ শাহ মসজিদেমাগরিবের নামাজ পড়েন তিনি। নামাজের পরে হত্যাকারীরা বিএনপি নেতাকর্মীর সঙ্গেমিশে যায়। এক পর্যায়ে বাবলার ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি করাহয়। গুলির শব্দ পেয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। কেউকেউ গুলিবিদ্ধ এরশাদ উল্লাহকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় মাটিতেলুটিয়ে পড়া বাবলাকে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে নির্বিঘ্নে চলেযায় সন্ত্রাসীরা।
পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাবলা সবসময় অস্ত্র নিয়েচলতেন। হত্যার দিন তাঁর সঙ্গে অস্ত্র ছিল না, এটা তাঁর কোনো ঘনিষ্ঠ সহযোগীর কাছথেকে তথ্য পেয়েছিলেন হত্যাকারীরা। তাই তারা বাবলার বাড়ির সামনে খুন করার ছককষে। এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে গেলে তিনি বাড়ি থেকে বের হবেন, এটা খুনিরানিশ্চিত ছিল। কারণ দেড় মাস আগে বাবলার বিয়েতে এরশাদ উল্লাহসহ অনেক নেতাউপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই এলাকার কোনো ভবনে সিসি ক্যামেরা ছিলনা। যার কারণে হত্যাকারীরা খুন করে কোন দিকে পালিয়েছে তা জানা যায়নি।জনসমাগম থাকায় হত্যাকাণ্ডের সময় অস্ত্রধারী কতজন ছিল তাও নিশ্চিত হওয়াযায়নি। তবে হত্যার ধরন ও অস্ত্রের ব্যবহার দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছেন ঘটনাস্থলেরায়হান, ইমন, বোরহান ও খোরশেদ ছিল। এই চারজনের গতিবিধির ওপর নজরদারিকরা এমন কয়েকটি সূত্রও তাদের উপস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছে।
আমার ছেলেকে খুন করেছে রায়হান’
নগরীর বায়েজিদ বোস্তামীর খোন্দকারাবাদ ফতেপুকুর পাড়ে যখন বাবলাকে গুলিকরা হয়, তখন অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর বাবা আবদুল কাদের। গুলির শব্দে অন্যরাপালিয়ে যান। ছেলেকে দোকানের সামনে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখে ছুটে যানতিনি। বয়োজ্যেষ্ঠ আবদুল কাদেরের পক্ষে ছেলেকে টেনে তোলা সম্ভব হয়নি। পরেঅনেক ডাকাডাকি করে আরও দুজনের সহায়তায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় তুলেতাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে বুধবার মধ্যরাতে সেই মর্মন্তুদ দৃশ্যের বর্ণনা দিচ্ছিলেন আবদুলকাদের। একপর্যায়ে বলেন, ‘রায়হান আমার ছেলেকে খুন করেছে। তিন দিন আগেওফোনে হুমকি দিয়েছিল। আমার ছেলে বলেছিল, ফোনে গালিগালাজ না করে সাহসথাকলে সামনে আয়।’তিনি বলেন, ‘প্রায় সময় ফোনে আমার ছেলেকে গালিগালাজকরত রায়হান। হুমকি দিত। তারা মনে করত বুড়ির নাতি সাজ্জাদকে (ছোট সাজ্জাদ) গ্রেপ্তারের পেছনে আমার ছেলের হাত আছে। কয়েক মাস আগে সাজ্জাদের অনুসারীরায়হানসহ চারজনের বিরুদ্ধে থানায় জিডিও করেছিলাম।’

রায়হান মোবারক হোসেন ইমন
জেল ও বিদেশে বসে পরিকল্পনা
বায়েজিদ বোস্তামীর জান আলী নগর চালিতাতলী এলাকার আব্দুল গনি কন্ট্রাক্টরেরছেলে সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। ২০০৪ সালে জামিনে বেরিয়ে বিদেশেপালিয়ে যায় শীর্ষ এই সন্ত্রাসী। অন্যদিকে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদহাটহাজারীর শিকারপুর গ্রামের সোনা মিয়া সওদাগর বাড়ির মো. জামালের ছেলে।
গত ১৫ মার্চ রাতে ছোট সাজ্জাদকে রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি থেকে গ্রেপ্তার করেপুলিশ। ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না বিভিন্ন সময় অভিযোগকরেছেন, তাদের পেছনে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে বাবলা।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর, নুর আহমদ ও আব্দুর রশিদ জানিয়েছেন, সাজ্জাদবাহিনী ছাড়ার পর বাবলা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সাজ্জাদের লোকজনকেধরিয়ে দিতেন, এতে ক্ষিপ্ত ছিল তারা। এর জেরে বাবলাকে সরিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগেসাজ্জাদ বাহিনী। কারাগারে বসে হত্যার ছক কষে ছোট সাজ্জাদ। পুরোনো যোগাযোগকাজে লাগিয়ে বিদেশে বসে অস্ত্র জোগাড় করে দেয় বড় সাজ্জাদ। মাঠে পরিকল্পনাবাস্তবায়ন করে তাদের অনুসারীরা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) হাসিব আজিজবলেন, এ ঘটনার মূল কুশীলব কারাগারে। বিদেশ থেকেও ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে। সব তথ্যআমাদের কাছে আছে।
নেপথ্যে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ
বিদেশে বসে চট্টগ্রাম নগরের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন সাজ্জাদ আলী খান। তাঁরঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন নুরুন্নবী ম্যাক্সন, সারোয়ার হোসেন বাবলা ও ঢাকাইয়াআকবর। ২০১৭ সালে জামিনে বেরিয়ে বিদেশে চলে যান ম্যাক্সন। ২০২২ সালে ভারতেমারা যান তিনি। ২০২০ সালে কাতার থেকে ফেরার পথে গ্রেপ্তার হন বাবলা। জামিনেবেরিয়ে সাজ্জাদ বাহিনী ছাড়েন। একাধিকবার গ্রেপ্তারের পর দলছুট হন ঢাকাইয়াআকবরও। এরপর ছোট সাজ্জাদকে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলেন বড়সাজ্জাদ। ২০১৫ সাল থেকে বড় সাজ্জাদের সাম্রাজ্য দেখভাল করতেন ছোট সাজ্জাদ।বিদেশ থেকে ফোন দিয়ে চাঁদা দাবি করতেন বড় সাজ্জাদ। চাঁদা দিতে কেউ অস্বীকারকরলে গুলি করে কিংবা কারখানা জ্বালিয়ে দিতেন ছোট সাজ্জাদ ও তাঁর সহযোগীরা।
নগরের পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, খুলশী ও হাটহাজারীর এলাকায় এখন শহর সম্প্রসারণহচ্ছে। উঠছে নতুন নতুন দালান। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে জামিনে বেরিয়েস্থানীয় নেতাকর্মীর সঙ্গে মিলে এসব এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে ইট–বালু সরবরাহ ওখালি প্লট ভরানোর কাজ করতেন বাবলা। গত বছর ৫ আগস্টের পর এসবের পুরোনিয়ন্ত্রণ নেন বাবলা। এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের সঙ্গেদীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব চলছিল। বাবলা ছিলেন চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধেচাঁদাবাজি, অস্ত্র, হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা ছিল ১৫টি।
বাবলার বাবা আবদুল কাদের বলেন, আমার ছেলে ওয়াজেদিয়া এলাকায় অন্তত দুইশপ্লট ভরাট করেছে। ইট–বালুও সরবরাহ করত। এগুলো কেড়ে নিতে চাচ্ছিল ছোটসাজ্জাদ। এই ব্যবসা কেড়ে নিতে না পেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
৯ খুনে রায়হান-ইমন
গত বছর ২৯ আগস্ট রাতে কুয়াইশ–অক্সিজেন সড়কে মো. আনিস (৩৮) ও মাসুদকায়ছারকে (৩২) গুলি করে হত্যা করা হয়। দুজনই যুবলীগের কর্মী ছিলেন। তারাবাবলার সঙ্গে ব্যবসা করতেন। একই বছরের ২১ অক্টোবর চান্দগাঁও থানার অদুরপাড়াএলাকায় গুলি করে আফতাব উদ্দিন তাহসীন (২৬) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়।তিনিও বাবলার সঙ্গে এলাকায় ইট–বালুর ব্যবসা করতেন।
গত ২৯ মার্চ রাতে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে বাবলাকে টার্গেট করে হত্যার চেষ্টাকরা হয়। এতে বাবলার দুই সহযোগী বখতেয়ার হোসেন মানিক ও আব্দুল্লাহ আলরিফাত খুন হন। গত ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রকাশ্য গুলি করে হত্যাকরা হয় ঢাকাইয়া আকবরকে। গত ২৫ অক্টোবর রাউজানে যুবদল কর্মী মো. আলমগীরআলমকে গুলি করে হত্যা ও এর আগে ১১ এপ্রিল রাউজানে যুবদল কর্মী ইব্রাহিমহত্যায়ও জড়িত রায়হান–ইমন জুটি। এসব হত্যা মামলার প্রায় সবকটির আসামিরায়হান, ইমন, বোরহান ও খোরশেদ।
মামলার প্রস্তুতি, গ্রেপ্তার নেই কেউ
এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে বাবলা হত্যার ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেজানিয়েছে পুলিশ। তবে কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এদিকে জনসংযোগে গুলিরঘটনায় বিএনপিও মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন নেতারা।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদবলেন, মামলার প্রস্তুতি এবং আমাদের অভিযান চলছে। এখনও কোনো আসামিগ্রেপ্তারের তথ্য নেই। নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, আমাদেরআইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
বিএনপির ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম
এরশাদ উল্লাহর ওপর হামলায় জড়িত ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের গ্রেপ্তারে ৪৮ ঘণ্টারসময় বেঁধে দিয়েছে বিএনপি। এ সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হলেআন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। গতকাল বিকেলে নগরের নুর আহমদসড়কের দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
আহত তিনজনের অবস্থা ভালো
জনসংযোগে গুলিবিদ্ধ হন নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ, ইরফানুল হকশান্ত, আমিনুল হক ও মর্তুজা হক। শান্ত ৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্মআহ্বায়ক। বাকি দুজনও বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। তারা নগরের এভারকেয়ারহাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ জানান, এরশাদ উল্লাহসহঅন্য দুজনের অবস্থা উন্নতির দিকে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। শান্ত এভারকেয়ারহাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। তাঁর অবস্থা এখনও অপরিবর্তিত।
সংবাদটি শেয়ার করুন
আরও পড়ুন…
















