
মো.রিয়াজুল সোহাগ,বিশেষ কলাম |
২০১০ সালের সেই নভেম্বরে ঢাকার বাতাস শুধু হিমেল ছিল না, তাতে মিশে ছিল বারুদের গন্ধ আর ক্ষমতার দম্ভ। মঈনুল রোডের যে বাড়িটি ছিল কয়েক দশকের ইতিহাসের সাক্ষী, তাকে যখন বুলডোজার আর বুটের তলায় পিষ্ট করা হচ্ছিল, তখন রাজপথ থেকে ওয়াশিংটন—প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল সবখানে। কিন্তু সেই ঢেউ কি তৎকালীন ‘মাস্টারমাইন্ডদের’ কানে পৌঁছেছিল? নাকি ক্ষমতার মদিরায় তারা তখন বধির হয়ে ছিলেন?
রাজপথে তখন রক্তের হোলি বেগম জিয়াকে যখন শাড়ি টেনে হিঁচড়ে ঘরছাড়া করা হচ্ছে, তখন বাইরে ঢাকা শহরকে এক অঘোষিত কসাইখানায় পরিণত করেছিল তৎকালীন পেটুয়া বাহিনী। বিএনপি ও তার মিত্রদের প্রতিবাদ দমাতে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘লৌহকপাট’ নীতি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সেই সময়ের কণ্ঠস্বর আজও অনেকের কানে বাজে— “এটি কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি রাজপরিবারের প্রতিহিংসা।” সেদিন নয়াপল্টন থেকে শুরু করে প্রেস ক্লাব—পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। শত শত নেতাকর্মীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ, কিন্তু মঈনুল রোডের সেই কান্না থামেনি।
কূটনৈতিক পাড়ায় ‘পিনপতন নীরবতা’ ও গভীর উদ্বেগ
বিশ্বের মোড়ল দেশগুলো সেদিন অবাক বিস্ময়ে দেখেছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নগ্ন রূপ। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন—সবার টেবিলেই ছিল মঈনুল রোডের সেই অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক নিপীড়ন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। পর্দার আড়ালে হিলারি ক্লিনটনের দপ্তর থেকে সরকারের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হলেও, শেখ হাসিনার সরকার তখন ‘আইনি মারপ্যাঁচে’র দোহাই দিয়ে সব উড়িয়ে দিয়েছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের রিপোর্টে স্পষ্ট বলেছিল, এটি কেবল উচ্ছেদ নয়, বরং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার এক নীল নকশা।
মঈনুল রোডের এই ‘অপারেশন’ চালানোর আগে অত্যন্ত গোপনে বিদেশি কিছু শক্তির ‘সবুজ সংকেত’ নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাবশালী এক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, জিয়া পরিবারের এই স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেললে
বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। সেই ভরসাতেই শেখ হাসিনা ও তার আট কুশীলব সেদিন আইনের তোয়াক্কা না করে মঈনুল রোডে ‘অপারেশন ক্লিনিং’চালিয়েছিলেন।
অভিশপ্ত সেই ১৩ নভেম্বর আজ ১৫ বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেদিন যারা বেগম জিয়ার চোখের জল দেখে অট্টহাসি হেসেছিলেন, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে আজ তারাই কাঠগড়ায়।
আন্তর্জাতিক মহল সেদিন যে শঙ্কা প্রকাশ করেছিল, পরবর্তী দেড় দশকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রহীনতা তারই প্রমাণ দিয়েছে। মঈনুল রোডের সেই উচ্ছেদ কেবল একটি বাড়ির দখল ছিল না, সেটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির শিষ্টাচার ও সহাবস্থানের কফিনে শেষ পেরেক।
ইতিহাসের পাল্টা আঘাত ২০১০: মঈনুল রোড থেকে অশ্রুসজল বিদায় খালেদা জিয়ার।২০২৪-২৫: সেই কুশীলবরাই আজ দেশত্যাগী বা বিচারপ্রক্রিয়ার সম্মুখীন।জনশ্রুতি: মানুষ বলছে, মঈনুল রোডের দীর্ঘশ্বাস বৃথা যায়নি।
আরও পড়ুন,
মতামত দিন…
Facebook Comments Box

















