
নেপথ্যে কোচিং বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য!
বিশেষ প্রতিনিধি, বেগমগঞ্জ (নোয়াখালী): নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার মিরওয়ারিশপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ভোলাবাদশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা, দাপ্তরিক অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং সরকারি নির্দেশনায় পরীক্ষা পরিচালনাকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অসন্তুষ্ট শিক্ষক ও স্বার্থান্বেষী মহলের একটি সংবদ্ধ চক্র সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ.বি.এম সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারসহ কয়েকজন শিক্ষক এ.বি.এম সাইফুল ইসলামকে কোণঠাসা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে একের পর এক বানোয়াট ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল এবং বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শিক্ষকদের দাপ্তরিক গাফিলতি ও বেআইনি কোচিং বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
বিদায়ি প্রধান শিক্ষকের হাতে দায়িত্ব ও কড়া তদারকি: জানা গেছে, গত বছরের ৩০শে জুন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরের অবসরজনিত বিদায়বেলায় প্রশাসনিক গতিশীলতা ফেরাতে এ.বি.এম সাইফুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই তিনি বিদ্যালয়ের একাডেমিক মানোন্নয়ন, সময়নিষ্ঠতা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি শুরু করেন।
অনিয়ম ধরে শো-কজ, ক্ষমা প্রার্থনা ও গোপনে অভিযোগ: বিদ্যালয়ের মূল উপস্থিতি রেজিস্টার ও প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করে দেখা যায়, সহকারী শিক্ষক লুৎফুন নাহার, মোহাম্মদ নূর হোসেন, মোহাম্মদ শাহ জামাল ও জেবুন্নাহার বেগমসহ কয়েকজন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বিনা অনুমতিতে বিলম্বে আগমন, হাজিরা খাতায় অনিয়ম এবং অনুমতি ছাড়াই বিদ্যালয় ত্যাগ করে আসছিলেন। শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিধি মোতাবেক তাঁদের একাধিকবার কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেন। প্রশাসনিক চাপ ও প্রমাণের মুখে উক্ত শিক্ষকরা পরবর্তীতে নিজেদের ভুল স্বীকার করে লিখিত কৈফিয়ত দেন এবং ভবিষ্যতে এমন আচরণ করবেন না মর্মে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে পরবর্তীতে তাঁরা জোট বেঁধে গোপনে একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন।
অভিযোগের জবাবে সশরীরে উপস্থিতি ও স্বজনদের ক্ষোভ: লুৎফুন নাহারদের সাজানো চক্রান্ত ও মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছে। ঘটনার প্রেক্ষাপটে ১০ই জানুয়ারি অভিযুক্তদের আনীত অভিযোগের বিস্তারিত ও লিখিত জবাব জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে জমা দেন ভুক্তভোগী শিক্ষক। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্তমানে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ্মীপুর জেলার বালুচরা ইউনিয়নে কর্মরত থাকলেও, মানবিক ও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে জেলা শিক্ষা অফিসার ভুক্তভোগী শিক্ষককে বদলি করেন। তবে স্থানীয়দের তীব্র অভিযোগ ও প্রশ্ন—প্রায় বছরখানেক আগে বিদ্যালয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষকদের স্বাক্ষরিত পত্রে অভিযুক্ত শিক্ষকদের শাস্তিমূলক বদলির বিষয়ে সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন পর কীভাবে ও কোথা থেকে তারা পার পেয়ে এই অপপ্রচার চালালো? ভুক্তভোগী শিক্ষকের বড় ভাই প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক আবুল হাশেম মন্তব্য করেন, “এমনিতেই এটি একটি সাজানো চক্রান্ত ছিল, তার ওপর দীর্ঘদিন পর কীভাবে এবং কোথা থেকে এমন এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা হলো, তা সম্পূর্ণ গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।”
আন্দোলনের মাঝে পরীক্ষা ও শীর্ষ ফলাফলের চমক: সম্প্রতি শিক্ষকদের দাবি আদায়ের দেশব্যাপী আন্দোলন চলাকালে সরকারি নির্দেশনা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অসন্তুষ্ট শিক্ষকদের অসহযোগিতা সত্ত্বেও সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শতভাগ পরীক্ষা সুসম্পন্ন হয়। এই সুশৃঙ্খল তদারকির ওপর ভিত্তি করেই বিদ্যালয়টি পরবর্তীতে জেলাজুড়ে শীর্ষ ফলাফলের অনন্য গৌরব অর্জন করে।
চক্রান্তের জাল ও ভিডিও ব্ল্যাকমেইল: পরীক্ষা পণ্ড করার চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়া এবং অনিয়মের দায়ে শো-কজ খেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন অভিযুক্ত শিক্ষকরা। নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অপরাধ ঢাকতে তাঁরা একজোট হয়ে শিক্ষকতার মহান পেশাকে কালিমালিপ্ত করতে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-র সাহায্যে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দৃশ্য সাজিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও তৈরি করেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত শিক্ষককে সরানোর চক্রান্ত ও কোচিং বাণিজ্য: অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটির অপপ্রচার কেবল সাবেক ভারপ্রাপ্ত শিক্ষককে বদলি করিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; ফেসবুকে নানা ধরনের ভিত্তিহীন পোস্ট লিখে ও অপপ্রচার চালিয়ে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারকেও প্রশাসনিক কাজে হেনস্তা ও কোণঠাসা করতে সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ শাহ জামাল এবং জেবুন্নাহার বেগমসহ একটি বিশেষ চক্র জোট বেঁধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
সরকারি বিধিমালা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শিক্ষকদের এই অপকর্মের মূল রহস্য উদ্ঘাটনে সম্প্রতি সরেজমিনে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানে সহকারী শিক্ষক শাহ জামালের নিজ ফ্ল্যাটবাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক চমকপ্রদ দৃশ্য! স্যারকে ডাকার পর তিনি ভেতরের একটি রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, তাঁর ফ্ল্যাটের ভেতরে গাদাগাদি করে প্রায় ৮ থেকে ৯ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে দেখা যায়। সরকারি নিয়ম অমান্য করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শিক্ষক শাহ জামাল কোনো সদুত্তর না দিয়ে উল্টো চরম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলেন, “আমিতো সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে কোচিং বাণিজ্য করছি না, এটা জাস্ট প্রাইভেট।”
সচেতন মহলের মতে, নিজেদের এই বেআইনি কোচিং বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা, বিদ্যালয়ে লেট-প্রেজেন্ট ও ফাঁকিবাজির পথ সুগম রাখতেই চক্রটি পর্যায়ক্রমে বর্তমান ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগ তুলে একের পর এক চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য: একজন শিক্ষকের মানহানি ও পুরো শিক্ষক সমাজকে হেয় করার এই অপচেষ্টার প্রতিবাদে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মিথ্যা অপপ্রচার, এআই দিয়ে বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সহকারী শিক্ষক জেসমিন আক্তার বাদী হয়ে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানায় একটি নিয়মিত মানহানির মামলা দায়ের করেছেন।
ঘটনার বিষয়ে নোয়াখালী পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো মানহানিকর ও বিভ্রান্তিকর এআই ভিডিওটি সাইবার ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। তদন্ত কাজ দ্রুত এগোচ্ছে; শিক্ষক হেনস্তা, বেআইনি কোচিং পরিচালনা ও ব্ল্যাকমেইলের সাথে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আরও জানতে চোখ রাখুন…
















