
ভারতে কেনা ডিগ্রিতে দেশে ‘ডাক্তার’!
বিশেষ প্রতিনিধি,বিডিনিউজ24.com:
এসএসসি বা এইচএসসি-তে মানবিক (আর্টস) বিভাগের গণ্ডি পেরোলেও নামের আগে জ্বলজ্বল করছে ‘ডাক্তার’ শব্দ! কোনো মেডিকেল কলেজে পড়ালেখার পাঠ নেই, নেই কোনো ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ; তবুও দিব্যি তারা হাড়-জোড়া থেকে শুরু করে জটিল সব রোগের বিশেষজ্ঞ! দেশে এমন অন্তত ১০ হাজার ভুয়া ডাক্তার প্রতিনিয়ত রোগীদের জীবন নিয়ে ছক কষে যাচ্ছেন। প্রতারণার এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে স্বাস্থ্য খাতের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই জালিয়াত চক্রের একটি বড় অংশ ভারতের কলকাতার ‘অল্টারনেটিভ মেডিকেল কাউন্সিল’ এবং উত্তরার কিছু বিতর্কিত ও পরবর্তীতে সিলগালা হওয়া প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সনদ কিনে নিয়েছে। এসব ডিগ্রির মধ্যে রয়েছে আয়ুর্বেদ, ইউনানী, হোমিওপ্যাথি কিংবা নিউরোপ্যাথীর মতো বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি। অথচ এসব ডিগ্রিতে নামের সামনে ‘ডাক্তার’ শব্দ ব্যবহার করা যে সম্পূর্ণ বেআইনি, তা আদালতের রায়েও স্পষ্ট করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আইনের তোয়াক্কা না করে এরা প্রতিনিয়ত প্যাডে প্রেসক্রিপশন লিখে ওষুধ দিচ্ছেন এবং একেকজন রোগীর কাছ থেকে ভিজিট হাঁকাচ্ছেন ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ১২০০ টাকা পর্যন্ত!
এই তালিকায় আরও যুক্ত হয়েছেন এক শ্রেণির ডিএমএফ (DMF) ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, যারাও একটি ভুয়া সার্টিফিকেটকে পুঁজি করে ফুল-টাইম ‘ডাক্তার’ সেজে বসে আছেন। স্থানীয় পর্যায়ে অর্থ ও প্রভাবের জোরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলায় এদের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার সুযোগ পান না স্থানীয় সাংবাদিকরাও।
রাজধানীর বাইরে মফস্বল এলাকাগুলোতে এই প্রতারণা রূপ নিয়েছে ভয়াবহ মহামারীতে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদার হাটের ‘মাতৃ ফার্মেসী’র স্বপন আচার্য্যের ঘটনাটি এর একটি বাস্তব উদাহরণ। কোনো স্বীকৃত ডাক্তারি ডিগ্রি ছাড়াই নামের আগে ‘ডাক্তার’ লিখে এবং ভিজিটিং কার্ডে ‘G.D.R.T.C (মেডিসিন)’ নামের অননুমোদিত কোর্স লিখে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘মেডিসিন, মা ও শিশু’ বিশেষজ্ঞ সেজে চেম্বার খুলে রোগী দেখছেন ও মোটা অঙ্কের ভিজিট নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, পার্শ্ববর্তী নরোত্তমপুরের ‘মফিজ ফার্মেসী’র মোঃ মফিজুর রহমান নামের আরেক ব্যক্তিও ‘M.F.P.C’ নামের ভিত্তিহীন সনদ দেখিয়ে নিজেকে ‘মা ও শিশু রোগের অভিজ্ঞ ডাক্তার’ দাবি করে রোগী দেখছেন। সরেজমিনে কথা বললে স্বপন আচার্য্য উল্টো ঔদ্ধত্য দেখিয়ে দাবি করেন— “ড্রাগ সুপারের পিএ ও ডাক্তার সমিতির সাথে তাদের যোগাযোগ রয়েছে, তাই কোনো ডিগ্রির প্রয়োজন নেই!”
এর আগেও এ অঞ্চলে অপচিকিৎসার শিকার হয়ে শিশু বিকলাঙ্গ হওয়াসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালী জেলা ড্রাগ সুপার সালমা সিদ্দিকা জানান, “এসব অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান ও ভুয়া চিকিৎসকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, অচিরেই অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
এদিকে, ভুয়া ডাক্তারদের সার্বিক অনিয়ম নিয়ে কথা বললে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) Registrar ডা. মো. লিয়াকত হোসেন স্পষ্ট জানান, “এমবিবিএস (MBBS) বা বিডিএস (BDS) ডিগ্রি এবং বৈধ বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কারও নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুয়া ডিগ্রির সনদে ডাক্তার লেখার সুযোগ আইনে নেই।” একই সঙ্গে প্রতারকদের হাত থেকে বাঁচতে রোগীদের বিএমডিসি’র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে তথ্য যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন বিএমডিসি কর্তৃপক্ষ।
তবে মূল সমস্যা সমাধান ও ভুয়া ডাক্তারদের সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দেওয়ার বদলে বিএমডিসি’র একটি বিতর্কিত নির্দেশনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ চিকিৎসকেরা। বিএমডিসি বিজ্ঞপ্তির ২ নম্বর ধারায় নিবন্ধিত চিকিৎসকদের প্রচার-প্রচারণার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে বলা হয়, চিকিৎসকরা বা তাদের পক্ষে অন্য কেউ চেম্বার বা প্র্যাকটিসের প্রচারণা চালালে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রংপুর মেডিকেল কলেজের ডা. নাজিব সাদাত এ প্রসঙ্গে কড়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
“ভুয়া ডাক্তারদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে। এরা কোনো মেডিকেল কলেজে না পড়ে, আর্টসের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে কলকাতা বা উত্তরার সিলগালা প্রতিষ্ঠান থেকে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট কিনে নামের আগে ‘ডাক্তার’ বসাচ্ছে। আদালতের রায় ও স্পষ্ট নিয়ম থাকার পরও ১০ হাজার ভুয়া ডাক্তার আর টেকনোলজিস্ট ধুমসে প্র্যাকটিস করছে, প্রেসক্রিপশন লিখে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা ভিজিট হাঁকাচ্ছে। কিন্তু বিএমডিসি আসল ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে, সাধারণ মানুষকে তথ্যসেবা দিয়ে সচেতন না করে উল্টো প্রকৃত চিকিৎসকদের প্রচার বন্ধের বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে! দিনশেষে ভুয়া ডাক্তার ও কবিরাজের চক্কর কেটে রোগীরা যখন আমাদের মতো বিশেষজ্ঞদের কাছে পোঁছান, তখন তাদের আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল রাজধানীতে নয়, নোয়াখালীসহ সারা দেশের মাঠপর্যায়ে কঠোর অভিযান চালিয়ে এই ১০ হাজার ভুয়া চিকিৎসকের সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে না দিলে এবং সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ না দিলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের এই ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া সম্ভব হবে না।
আরও জানতে চোখ রাখুন…

















