
রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ
মো. রিয়াজুল সোহাগ | বিডিনিউজ24 ডেস্ক
দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে রাষ্ট্রের মূলধারায় কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য রোধ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
‘নারীর মর্যাদা, সুরক্ষা ও সমৃদ্ধি’—এই তিন মূলনীতিকে সামনে রেখে প্রণীত হচ্ছে দলটির এই মহাপরিকল্পনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে নারী অধিকার রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগেই দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এই কর্মপরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। ইতোমধ্যে এর খসড়া প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং দলীয় বিভিন্ন ফোরামে তা পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
নারীর নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষায় অগ্রাধিকার
কর্মপরিকল্পনায় নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, ইভ টিজিং ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ নারী সুরক্ষা আইন আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে পৃথক ট্রাইব্যুনাল এবং বিশেষ প্রসিকিউশন সেল গঠনের কথাও বলা হয়েছে।পরিকল্পনার আওতায় প্রতিটি থানায় নারী ডেস্ককে কার্যকর করা, নারী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগী নারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নতুন উদ্যোগ
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে বিএনপি এই কর্মপরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। এতে গ্রামীণ ও শহুরে নারীদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে পোশাকশিল্প, কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পৃথক প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতে সমান মজুরি নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও থাকছে এই পরিকল্পনায়।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদা
নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে দেখছে বিএনপি। কর্মপরিকল্পনায় মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধে বিশেষ উপবৃত্তি, কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় কোটা সম্প্রসারণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে আবাসিক স্কুল-কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ
বিএনপির মতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। সে কারণে দলীয় কাঠামোসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সব স্তরে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ও নীতিগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে কর্মপরিকল্পনার তাৎপর্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; বরং এটি নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ হতে পারে। তবে তারা মনে করেন, এর সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
এ বিষয়ে বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা, জিয়াউর রহমান সমাজকল্যাণ পরিষদের সভাপতি গিয়াসউদ্দিন খোকন, বিডিনিউজ টুয়ান্টিফোরকে বলেন,
“নারী শুধু ভোটার নন, তারা রাষ্ট্রের শক্তি। তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই টেকসই হতে পারে না।”
নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষায় বিএনপির এই ‘সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়—পরিকল্পনাটি কতটা বাস্তব রূপ পায় এবং তা দেশের নারীদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
আরও জানতে চোখ রাখুন…


















