
॥ বিশেষ ফিচার ॥
মো.রিয়াজুল সোহাগ, বিডিনিউজ২৪|
ডিজিটাল যুগে আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধার ভিড়ে এখন রাজনৈতিক মহলে তুঙ্গে থাকা আলোচনার নাম বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতি। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের কার্ডের প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশের আমজনতার কাছে ধারণাটি নতুন। ফলে জনমনে প্রশ্ন—আসলে কী এই কার্ড? আর এটি দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কী পরিবর্তন আসবে?
বিদেশের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সরকার নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিভিন্ন কার্ড সরবরাহ করে। অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। সেখানে সব নাগরিকের জন্য রয়েছে ‘মেডিকেয়ার কার্ড’, যা দিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা মেলে। আবার নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রয়েছে ‘সেন্টারলিংক’ বা ‘হেলথকেয়ার’ কার্ড। জীবনধারণের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ এই কার্ডে দেওয়া হয়। এমনকি বিদেশের মাটিতে থাকা আমাদের প্রবাসীদের বড় একটি অংশও এই কার্ডের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশে বিএনপির প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ হতে পারে ঠিক তেমনই এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের বা আয়ের উৎস নেই—এমন নারীদের জন্য এটি একটি ‘লাইফ চ্যাঞ্জিং’ সিদ্ধান্ত হতে পারে। আমাদের দেশের নারীদের ছোটখাটো প্রয়োজনে এখনও অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। এই কার্ড চালু হলে একজন নারী নিজের নূ্যনতম প্রয়োজন নিজেই মেটাতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন পুরুষদের ওপর বাড়তি চাপ কমবে, অন্যদিকে পরিবারে আসবে আর্থিক স্বস্তি ও শান্তি। অস্ট্রেলিয়ার গত নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রধান তুরুপের তাস বা ‘ট্রাম কার্ড’ ছিল এই ‘মেডিকেয়ার’ কার্ড। বাংলাদেশেও নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতিটি সময়ের দাবি এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।
চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের ৫ ফর্মুলা
উন্নত দেশে সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তি মজবুত হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়নের পথে চারটি বড় ‘কাঁটা’ রয়েছে: ১. মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি, ২. সঠিক তালিকার অভাব, ৩. মানুষের কর্মবিমুখ হওয়ার আশঙ্কা এবং ৪. ডিজিটাল জালিয়াতি।
তবে উত্তরণের জন্য ৫টি পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক:
* নিখুঁত ডিজিটাল ডাটাবেজ: এনআইডি-র সাথে আয়কর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য জুড়ে দিয়ে একটি নিরপেক্ষ তালিকা করা।
* সরাসরি পেমেন্ট (G2P): কোনো ভায়া ছাড়াই কার্ডের টাকা সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক একাউন্টে পাঠানো।
* দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে কার্ড: কার্ড হবে নাগরিকের অধিকার, দলের দান নয়।
* ডিজিটাল সহায়তা কেন্দ্র: প্রতিটি ইউনিয়ন সেন্টারে অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত নারীদের জন্য ‘হেলথ-ডেস্ক’ রাখা।
* বাজার ও ফান্ডের সমন্বয়: মেগা প্রজেক্টের খরচ কমিয়ে এই বিশাল ফান্ডের জোগান দেওয়া এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ।
হয়রানি রোধে তারেক রহমানের ‘৫ টি কাজ’ ও জনগনের দায়িত্ব প্রান্তিক নারীরা যাতে জালিয়াতির শিকার না হন, সে জন্য প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে:
১. বায়োমেট্রিক ও ওটিপি: টাকা তোলার সময় মোবাইলে ওটিপি বা আঙ্গুলের ছাপ বাধ্যতামূলক করা।
২. সরাসরি ক্যাশ আউট: কোনো এজেন্ট বা নেতার মাধ্যমে নয়, সরাসরি এটিএম বা ডিজিটাল সেন্টার থেকে টাকা তোলা।
৩. হেল্প-ডেস্ক ও হটলাইন: কার্ড সংক্রান্ত সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানে ২৪ ঘণ্টা চালু টোল-ফ্রি নম্বর।
৪. অটোমেটেড এসএমএস: কার্ডে টাকা জমা হওয়া বা তোলার সাথে সাথে মোবাইলে অ্যালার্ট আসা।
৫. ভ্রাম্যমাণ মনিটরিং: নিয়মিত ঝটিকা পরিদর্শন করে সুবিধাভোগীরা কোনো স্থানীয় চাপের মুখে আছেন কি না তা যাচাই করা।
সাধারণ মানুষের ভূমিকা:
এই প্রজেক্ট সফল করতে নাগরিকদের সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে। সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও কার্ড পাওয়ার লোভ সংবরণ করা এবং এলাকায় কোনো অযোগ্য ব্যক্তি জালিয়াতি করে কার্ড নিচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখা নাগরিক দায়িত্ব।
ফ্যামিলি কার্ড প্রচার: ৭ দিনের তৃণমূল অ্যাকশন প্ল্যান
১ম দিন: উঠান বৈঠক (নারী সমাবেশ)
কাজ: পাড়ার বা গ্রামের নারীদের নিয়ে ছোট ছোট গ্রুপে উঠান বৈঠক করা।
লক্ষ্য: তাদের বোঝানো যে এটি কেবল টাকা নয়, তাদের সম্মানের অধিকার। অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টির গুরুত্ব বুঝিয়ে বলা।
২য় দিন: লিফলেট ও QR কোড বিতরণ
কাজ: হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ড এবং জনবহুল এলাকায় কিউআর কোড সম্বলিত লিফলেট বিতরণ।
লক্ষ্য: তরুণ প্রজন্মকে কিউআর কোড স্ক্যান করে তথ্য দেখতে উৎসাহিত করা, যাতে তারা তাদের পরিবারের নারীদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে পারে।
৩য় দিন: ডিজিটাল ডেমনস্ট্রেশন (সচেতনতা)
কাজ: ছোট প্রজেক্টর বা ট্যাবের মাধ্যমে তারেক রহমানের ভিডিও বার্তা দেখানো।
লক্ষ্য: কার্ডের নিরাপত্তা (ওটিপি, বায়োমেট্রিক) কীভাবে কাজ করবে তা চোখের সামনে তুলে ধরা, যাতে মানুষের মনে জালিয়াতির ভয় কেটে যায়।৪র্থ দিন: ‘দালালকে না বলুন’ ক্যাম্পেইন
কাজ: সচেতনতামূলক মাইকিং এবং পথসভা।
লক্ষ্য: মানুষকে সতর্ক করা যে, কার্ড পেতে কোনো টাকা বা উপঢৌকন লাগে না। যদি কেউ টাকা চায় তবে তাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা।
৫ম দিন: সহায়তা কেন্দ্র (হেল্প-ডেস্ক) স্থাপন
কাজ: ইউনিয়ন পর্যায়ে অস্থায়ী তথ্য কেন্দ্র খোলা।
লক্ষ্য: যাদের এনআইডি বা তথ্যে ভুল আছে, তাদের কার্ডের জন্য যোগ্য হওয়ার গাইডলাইন দেওয়া।৬ষ্ঠ দিন: সরাসরি মতবিনিময় ও ফিডব্যাক
কাজ: সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ও আশঙ্কার উত্তর দেওয়া।
লক্ষ্য: স্থানীয় মানুষ কী ভাবছে তা শোনা এবং তাদের জানানো যে “কার্ড হবে আপনার অধিকার, দলের করুণা নয়।”৭ম দিন: শপথ গ্রহণ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা
কাজ: একটি বড় জনসভা বা সমাবেশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বজায় রাখার অঙ্গীকার করা।
লক্ষ্য: জনগণকে আশ্বস্ত করা ,তারেক রহমানের স্বপ্ন এদেশের যুবও তরুণদের মেধা ভিত্তিক কাজে লাগানো সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও দারিদ্র মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা এবং শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অস্ট্রেলিয়ায় এ কার্ড সিস্টেম সফল হয়েছে কারণ সেখানে শক্তিশালী সিস্টেম রয়েছে। বাংলাদেশে এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে কেবল তারেক রহমানের একা সম্ভব নয়, প্রয়োজন প্রযুক্তির স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
চোখ রাখুন পরের পাতায়…


















