বিশেষ প্রতিবেদন,আপডেট বিডিনিউজ24.com|
আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্রের এক অভিনব জালিয়াতির শিকার হতে গিয়েও নিজের পেশাদার বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতায় রক্ষা পেলেন বাংলাদেশের নোয়াখালী অঞ্চলের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট **রিয়াজুল সোহাগ**। শুধু তাই নয়, জালিয়াতি চক্রের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের ডিজিটাল প্রমাণসহ আন্তর্জাতিক সাইবার ক্রাইম ইউনিটে রিপোর্ট করেছেন তিনি।
"যেভাবে শুরু হয় এই প্রতারণা"
সম্প্রতি ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিজেকে ‘জেনিফার ক্লারা’ নামের এক মার্কিন ব্যাংক অডিটর পরিচয় দিয়ে এক নারী সাংবাদিক রিয়াজুল সোহাগের সাথে যোগাযোগ করেন। প্রতারক দাবি করেন, জনৈক ‘জেমস ইউসুফ’ নামক এক ব্যক্তি একটি মার্কিন ব্যাংকে ৬ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭০ কোটি টাকা) রেখে মারা গেছেন, যার কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী নেই। সাংবাদিককে সেই অর্থের অংশীদার করার প্রলোভন দেখিয়ে তার ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই ছিল চক্রটির মূল লক্ষ্য।
ভুয়া নথিপত্রের জাল
প্রতারক চক্রটি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য বেশ কিছু ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে জেমস ইউসুফের ভুয়া মৃত্যু সনদ এবং একটি ডিপোজিট সার্টিফিকেট। তবে ঘটনার মোড় ঘুরে যায় যখন অভিজ্ঞ সংবাদকর্মী রিয়াজুল সোহাগ প্রতারক চক্রের কাছে পাল্টা অগ্রিম খরচ বা ‘ডলার’ দাবি করে তাদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেন।
"জেমস প্র্যাঙ্ক’ ও ধরা পড়া জালিয়াতি"
রিয়াজুল সোহাগের চাপের মুখে প্রতারক চক্রটি তড়িঘড়ি করে একটি ভুয়া ব্যাংক ট্রান্সফার রশিদ তৈরি করে পাঠায়। ‘ব্যাংক অফ আমেরিকা’-এর আদলে তৈরি সেই রশিদে প্রেরকের নাম হিসেবে লেখা ছিল **"JAMES PRANK"** এবং বিশেষ নোটে লেখা ছিল **"RSM TOOOBAD"**। ইংরেজি ‘প্র্যাঙ্ক’ (Prank) শব্দের অর্থ রসিকতা বা তামাশা। এটি দেখেই সাংবাদিক নিশ্চিত হন যে, কোনো জালিয়াতি চক্র ইন্টারনেটের ছবি এডিট করে এই ভুয়া রশিদ তৈরি করেছে।
"আক্রমণাত্মক আচরণ ও হুমকি"
জালিয়াতি ধরা পড়ার পর ‘জেনিফার’ নামক ওই প্রোফাইল থেকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়। সাংবাদিককে ফোনে কথা বলতে এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য দিতে বারবার চাপ প্রয়োগ করা হয়। ব্যর্থ হয়ে চক্রটি তাকে ‘Nonsense’ ও ‘Big Fool’ বলে গালিগালাজ করে এবং আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ভয় দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে তারা অপমানজনক একটি **"GET OUT"** সম্বলিত ছবি পাঠিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে।
"আইনি পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা"
সাংবাদিক রিয়াজুল সোহাগ ইতিমধ্যেই এই চক্রের বিরুদ্ধে মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা **এফবিআই-এর ইন্টারনেট ক্রাইম কমপ্লেইন্ট সেন্টার (IC3)** এবং বাংলাদেশের **সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে** ডিজিটাল প্রমাণসহ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
"তদন্ত ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি"
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের আন্তর্জাতিক স্ক্যামাররা সাধারণত উন্নত দেশের নাগরিক সেজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্বের আড়ালে এই জাল বিস্তার করে।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, "প্রতারকরা যখন বুঝতে পারে যে তাদের লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিটি সচেতন, তখন তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন আইনি হুমকি দিতে শুরু করে। রিয়াজুল সোহাগের মতো সাহসিকতার সাথে তথ্য সংগ্রহ করে অভিযোগ করলে এই চক্রগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত করা সহজ হয়।"
এই ঘটনার পর অভিযুক্ত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি বর্তমানে নিষ্ক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রিয়াজুল সোহাগ জানিয়েছেন, তিনি এই পুরো বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথেও যোগাযোগ রাখছেন যাতে সাধারণ মানুষ এমন ফাঁদে পা না দেয়।
পাঠকদের প্রতি পরামর্শ:
অপরিচিত কোনো আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে উত্তরাধিকার বা লটারির প্রলোভন এলে তা এড়িয়ে চলুন। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য বা কোনো গোপন পাসওয়ার্ড কারো সাথে শেয়ার করবেন না। সন্দেহজনক কিছু ঘটলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন।
আরও জানতে চোখ রাখুন...