🌐 ধর্ম ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
মৃত দেহের বিলীন হওয়া এবং কিয়ামতের দিন পুনর্জাগরণের বৈজ্ঞানিক–আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ মানবজীবনের অবশ্যম্ভাবী সত্য হলো মৃত্যু। মৃত্যু পরবর্তী সময়ে মানুষের দেহ তার স্বাভাবিক কাঠামো হারিয়ে ফেলে—ত্বক, মাংস, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষয়ে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। এমনকি হাড়গুলিও অনন্ত কালের প্রভাবে বিলীন হয়ে ওঠে।
তবে ইসলামী আকিদায় মৃত্যু চূড়ান্ত পরিণতি নয়।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন—এটি কুরআন-হাদীসের অকাট্য প্রমাণিত সত্য। মানুষের সেই পুনর্জন্ম কীভাবে সম্ভব? কোন উপাদান থেকে মানবদেহের পুনর্গঠন হবে?—এই বিষয়ে একটি শক্তিশালী ও প্রামাণ্য হাদীস রয়েছে।
মূল হাদীস ও ব্যাখ্যা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“মানুষের দেহ মাটিতে বিলীন হয়ে যাবে, শুধুমাত্র লেজের গোড়ার হাড় (عَجْبُ الذَّنَبِ) ব্যতীত; কিয়ামতের দিন সেখান থেকেই মানুষের পুনর্গঠন করা হবে।”
—সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম
হাদীসে উল্লেখিত ‘লেজের গোড়ার হাড়’ কে আরবি ভাষায় বলা হয় আযমুজ-যানব।
আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী এটি মানুষের মেরুদণ্ডের নিচের অংশে অবস্থিত coccyx bone, যা শক্ত ও ঘন কাঠামোর এক ক্ষুদ্র হাড়।
মৃত্যুর পর মানুষের দেহের ক্ষয়—বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা
১. মৃত্যু পর দেহের রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হলে কোষগুলো ভেঙে যেতে শুরু করে।
২. ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস, পোকামাকড় এবং মাটির রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত মাংসপেশি ও ত্বক পচে যায়।
৩. সময়ের ব্যবধানে হাড়গুলো পর্যন্ত ভেঙে বিলীন হয়ে যায়।
ব্যতিক্রম: আযমুজ-যানব (লেজের গোড়ার হাড়)
হাদীস অনুযায়ী, মানবদেহের অন্যান্য সব অংশ নষ্ট হলেও এই বিশেষ হাড়টি কখনো পুরোপুরি নষ্ট হয় না।
এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের পুনরুত্থানের একটি 'বীজ', একটি মৌলিক মূল উপাদান—যার ওপর ভিত্তি করে কিয়ামতের দিন মানবদেহ পুনর্গঠিত হবে।
কিয়ামতের দিন দেহের পুনর্গঠন—হাদীসের আলোকে
হাদীসে বর্ণিত—
আল্লাহ এই অবিনশ্বর হাড়টিকে ভিত্তি বানিয়ে নতুনভাবে মানবদেহ সৃষ্টি করবেন।
মানুষের চোখ, কান, মস্তিষ্ক, হাত, পা—সবই নতুনভাবে গঠন করা হবে।
এরপর মানুষকে পুনর্জীবিত করে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে।
সেদিন আর কেউ লুকোতে পারবে না—হিসাব-নিকাশ হবে নিখুঁতভাবে।
এটি আল্লাহর অপরিমেয় শক্তির নিদর্শন হাদীসের নির্ভরযোগ্য সূত্রসমূহ
এই হাদীসটি ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত:
সহীহ বুখারী: ৪৮১৪, ৪৮৫৬
সহীহ মুসলিম: ২৯৫৫
সুনান ইবনে মাজাহ: ৪২৬৬
সুনান নাসাঈ: ২০৭৭
সুনান আবু দাউদ: ৪৭৪৩
মুওয়াত্তা মালিক: ৪৬৯
মুসনাদে আহমাদ: ৮০৮৪, ৯২৪৪, ১০০১১সমস্ত উলামা, মুহাদ্দিস ও গবেষকের মতে এটি সহীহ ও অবিসংবাদিত হাদীস।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয় বিষয়
১️⃣ আল্লাহর সীমাহীন সৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ বিলীন দেহকে পুনরায় গঠন করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব—
কিন্তু আল্লাহর জন্য এটি সবচেয়ে সহজ বিষয়।
২️⃣ মৃত্যুর অনিবার্যতা
মৃত্যুর পর মানুষ বিলীন হয়ে গেলেও—
এটাই শেষ নয়। মানুষের আরেকটি নতুন জীবন অপেক্ষমাণ।
৩️⃣ কিয়ামত ও পুনরুত্থান—বাস্তব সত্য
এই হাদীস প্রমাণ করে যে, পুনরুত্থান কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়—এটি আল্লাহর নির্ধারিত বাস্তবতা।
৪️⃣ আখিরাতের প্রস্তুতি যেহেতু পুনরুত্থান নিশ্চিত—মানুষের উচিত দুনিয়ায় সৎকর্মে মনোযোগী হওয়া।
মানুষের দেহের ক্ষয় ও পুনর্গঠন—দুটি-ই বাস্তব প্রক্রিয়া।
মৃত্যুর পর দেহ বিলীন হলেও আযমুজ-যানব হাড়টি আল্লাহর হিফাজতে অটুট থাকে।সেখান থেকেই কিয়ামতের দিন পুনর্জন্ম হবে।
হাদীসের এই ব্যাখ্যা মুসলমানদের মৃত্যুর পরের জীবন, আখেরাত ও আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে গভীর ভাবনার আহ্বান জানায় এবং ঈমানকে আরও দৃঢ় করে।