সম্পদের মালিক মানুষ নয়, মালিক আল্লাহ। মানুষ কেবল আমানতদার। তাই জীবনের পর্দা নামার পর রেখে যাওয়া সম্পদও মানুষের ইচ্ছায় নয়, আল্লাহর নির্ধারিত বিধানেই বণ্টিত হওয়ার কথা। অথচ উত্তরাধিকার ইসলামের একটি সুস্পষ্ট বিধান হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে অজ্ঞতা, আবেগ ও সামাজিক প্রচলনের কারণে বহু পরিবারে সম্পদ বণ্টন নিয়ে তৈরি হয় বিরোধ, বঞ্চনা ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ফাটল। বিশেষ করে সন্তান ও পিতা-মাতা না রেখে কেউ মারা গেলে তার সম্পদের উত্তরাধিকার কারা হবেন এ প্রশ্নটি ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
'ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য, আর স্থায়ী সৎকাজ আপনার রবের কাছে প্রতিদানের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ এবং আশার দিক থেকেও উত্তম।'
এই সম্পদ মানুষের হাতে আমানত হিসেবে এসেছে। সে কারণেই উত্তরাধিকার বণ্টনেও আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য একটি সুসংবদ্ধ বিধান নির্ধারণ করেছেন। ইসলামী পরিভাষায় এ শাস্ত্রকে বলা হয় ‘ইলমুল ফারায়েজ’ উত্তরাধিকারবিষয়ক জ্ঞান। নবীজি সা. এ জ্ঞান অর্জন ও প্রচারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে,
'তোমরা ফারায়েজ শিক্ষা করো এবং তা মানুষকে শিক্ষা দাও।'
ফারায়েজের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি কেবল মৃত ব্যক্তির সম্পদ ভাগ করার একটি হিসাব নয়,বরং এটি আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার যথাযথ ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিধান। মানুষের জীবনের একটি অংশ জুড়ে থাকে ইবাদত, লেনদেন ও সামাজিক দায়িত্বের বিধান, আর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পদের গন্তব্য নির্ধারণ করে ফারায়েজের বিধান। এ কারণেই ফকিহগণ ইলমুল ফারায়েজকে ইসলামী জ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
সন্তান ও পিতা-মাতা না রেখে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে ফিকহের পরিভাষায় তার অবস্থা ‘কালালাহ’ এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কুরআনে সূরা আন-নিসার শেষাংশে কালালাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান এসেছে। সাধারণভাবে এমন মৃত ব্যক্তিকে কালালাহ বলা হয়, যার মৃত্যুর সময় সন্তান-সন্ততি এবং পিতা-মাতার মতো ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন উত্তরাধিকারী জীবিত নেই, তবে অন্যান্য নিকট আত্মীয় জীবিত রয়েছেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি শুধু ‘সন্তান নেই’ বলেই প্রত্যেক মৃত ব্যক্তিকে কালালাহ বলা যাবে না। পিতা, দাদা, সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা অন্যান্য উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ওপর উত্তরাধিকার কাঠামো পরিবর্তিত হয়। ফলে বাস্তব কোনো সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ ধারণার ওপর নির্ভর না করে যোগ্য আলেম বা ফারায়েজ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সম্পূর্ণ উত্তরাধিকারী তালিকা যাচাই করা অপরিহার্য।
কালালাহর ক্ষেত্রে প্রথমে শরিয়ত নির্ধারিত অংশীদারদের অংশ দিতে হয়। মৃত ব্যক্তি যদি নারী হন এবং তাঁর স্বামী জীবিত থাকেন, সন্তান না থাকার অবস্থায় স্বামী সাধারণত অর্ধেক (১/২) সম্পদের অধিকারী হন। আর মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে এবং তাঁর সন্তান না থাকলে স্ত্রী একজন হোক বা একাধিক মোট এক-চতুর্থাংশ (১/৪) অংশ পাবেন।
মা জীবিত থাকলে তাঁর অংশও পরিস্থিতিভেদে নির্ধারিত হয়। মৃতের একাধিক ভাই-বোন থাকলে মা এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) পাবেন। আর এমন বাধা না থাকলে তাঁর অংশ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) হতে পারে। তবে দাদি বা নানির উত্তরাধিকারও পরিস্থিতিনির্ভর, মা জীবিত থাকলে সাধারণত দাদি উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
মৃত ব্যক্তির বৈপিত্রেয় ভাই-বোন অর্থাৎ একই মায়ের সন্তান কিন্তু পিতা ভিন্ন থাকলে তাদের জন্যও শরিয়তে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। একজন হলে ১/৬, আর একাধিক হলে সম্মিলিতভাবে ১/৩ অংশের বিধান রয়েছে। এই নির্দিষ্ট অংশের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী সমান অংশ পায়।
অন্যদিকে সহোদর ভাই-বোন অর্থাৎ একই পিতা-মাতার সন্তান থাকলে উত্তরাধিকার কাঠামো আরও বিস্তৃত হয়। একজন সহোদর বোন থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে তিনি ১/২ পেতে পারেন। দুই বা ততোধিক হলে তারা সম্মিলিতভাবে ২/৩ পেতে পারেন। তবে সহোদর ভাই ও বোন একসঙ্গে থাকলে তারা আসাবা হিসেবে অবশিষ্ট সম্পদ পেতে পারেন এবং তখন পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান হয়।
বৈমাত্রেয় ভাই-বোন অর্থাৎ একই পিতার সন্তান কিন্তু মা ভিন্ন এর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তবে তারা উত্তরাধিকারী হবে কি না এবং কতটুকু পাবে, তা নির্ভর করে অন্য নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী, বিশেষত সহোদর ভাই-বোনের উপস্থিতির ওপর। তাই শুধু সম্পর্কের নাম শুনে অংশ নির্ধারণ করা শরিয়তসম্মত নয়, উত্তরাধিকারীদের পূর্ণ তালিকা সামনে রেখে হিসাব করতে হয়।
কেউ যদি ভাই-বোন ছাড়াই কালালাহ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, তখন অবশিষ্ট সম্পদের ক্ষেত্রে আসাবা হিসেবে নিকটবর্তী পুরুষ আত্মীয়দের অগ্রাধিকার আসে। এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে সহোদর ভাইয়ের ছেলে, বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ছেলে, আপন চাচা এবং বৈমাত্রেয় চাচার মতো আত্মীয়দের বিধান সামনে আসে। নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী থাকলে দূরবর্তী উত্তরাধিকারী বঞ্চিত হতে পারেন ফারায়েজের অন্যতম মৌলিক নীতি এটি।
উত্তরাধিকার আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৌন্দর্য হলো এটি মানুষের আবেগ বা সামাজিক ক্ষমতার হাতে সম্পদের ভাগ্য ছেড়ে দেয়নি। একজন ধনী ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর সম্পদ কে কতটুকু পাবেন, তা নির্ধারণের অধিকার পরিবারের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যের নয়, আল্লাহর বিধানই সেখানে চূড়ান্ত মানদণ্ড।
এখানেই আমাদের সমাজের একটি প্রচলিত ভুল ধারণার অবসান প্রয়োজন। অনেকেই মনে করেন, মৃত ব্যক্তির শুধু কন্যা বা নাতনি থাকলে তাঁর ভাই-বোন কোনো অংশ পাবেন না। অথচ ফিকহের বহু ইমামের ব্যাখ্যায় দেখা যায়, শুধু কন্যা বা নাতনি থাকলে নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভাই-বোন আসাবা হিসেবে পেতে পারেন। বিপরীতে মৃত ব্যক্তির ছেলে বা পুত্রের মাধ্যমে নাতি থাকলে ভাই-বোনের উত্তরাধিকার ভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়।
সহিহ বুখারিতে রাসুলুল্লাহ সা. এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে, নির্ধারিত অংশীদারদের তাদের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ নিকটতম পুরুষ আত্মীয় পাবে। এই নীতিই ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
তবে উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত ব্যক্তির সম্পদ সরাসরি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যাবে না। প্রথমে তাঁর দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় ব্যয়, বৈধ ঋণ এবং শরিয়তসম্মত ওসিয়ত প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পন্ন করতে হবে। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে। এ হিসাবেও ভুল হলে কারও অধিকার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উত্তরাধিকার নিয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ অন্যায় হলো দুর্বল উত্তরাধিকারীর অধিকার আত্মসাৎ করা। বিশেষত কন্যা, বোন, বিধবা বা অন্যান্য নারী উত্তরাধিকারীকে সামাজিক চাপ, আবেগ কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের অজুহাতে তাঁদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উত্তরাধিকার কেবল সম্পদের প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের হক বা অধিকার।
তাই মৃত্যুর পর সম্পদ নিয়ে পারিবারিক বৈঠকে বসার আগে প্রয়োজন জ্ঞান, আবেগের আগে প্রয়োজন শরিয়তের বিধান, আর প্রচলিত রীতির আগে প্রয়োজন কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা। কারণ উত্তরাধিকার এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সামান্য ভুল হিসাবও একজন মানুষের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নিতে পারে।
সম্পদের মালিকানা নিয়ে মানুষের অহংকার যত দীর্ঘই হোক, মৃত্যুর মুহূর্তে সব হিসাব থেমে যায়। যে সম্পদকে মানুষ নিজের বলে আগলে রাখে, মৃত্যুর পর সেটিই হয়ে যায় অন্যের অধিকার। তাই ইসলামের ফারায়েজ আমাদের শুধু সম্পদ ভাগ করতে শেখায় না, শেখায় আমানতদারি, ন্যায় এবং আল্লাহর বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ।
আল্লাহ আমাদের তাঁর দেওয়া সম্পদের অপচয়, অন্যায় দখল ও উত্তরাধিকারীদের হক নষ্ট করা থেকে হেফাজত করুন এবং কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্পদ বণ্টনের তাওফিক দান করুন।(আমিন)
তথ্যসূত্র,
সূরা আল-কাহাফ, আয়াত ৪৬।
মুস্তাদরাক আল-হাকিম, হাদিস ৮০৫৭।
সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৭৩৬।
ফাতহুল বারি, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১–১২।
আল-মাবসুত, খণ্ড ২৯, পৃষ্ঠা ২৩৭।
রদ্দুল মুহতার—ইবনে আবেদিন (রহ.)।