মো. রিয়াজুল সোহাগ,নিউজ ডেস্ক বিডিনিউজ24|
সংসদ ভবনের উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার নিচে যখন জনমতের প্রতিফলন ঘটার কথা, তখন বিরোধী দলের কক্ষত্যাগ বা 'ওয়াকআউট' কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোর গভীর ক্ষতের সংকেত। সাম্প্রতিক অধিবেশনে বিরোধী সদস্যদের এই প্রস্থান বিশ্বজুড়ে চর্চিত সংসদীয় শিষ্টাচারের বিপরীতে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আধুনিক বিশ্বে একটি সংসদ তখনই সফল, যখন সেখানে বিতর্কের ঝড় ওঠে, কিন্তু তা কক্ষত্যাগে গিয়ে ঠেকে না। যখনই সংসদে ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়, তখনই গণতন্ত্র তার প্রাণশক্তি হারায়। পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলতে না দেওয়া বা জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা সংসদকে একটি ‘একতরফা মঞ্চে’ পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
গণতন্ত্রের বিবর্তন ও আমাদের অবস্থান
বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে বিরোধী দলকে 'শ্যাডো গভর্নমেন্ট' বা ছায়া সরকার বলা হয়। তাদের প্রতিটি সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ হিসেবে। কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপটে ওয়াকআউট যেন একটি নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দল যখন অভিযোগ করে যে তাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, তখন বুঝতে হবে আলোচনার জানালাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর জানালা বন্ধ থাকলে সেখানে মুক্ত বাতাসের বদলে গুমোট অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়।দায়িত্ব কেবল একপক্ষের নয়
সংসদকে কার্যকর রাখার প্রাথমিক দায়িত্ব সরকারি দলের হলেও বিরোধী দলের দায়বদ্ধতাও কম নয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এই মূল্যবান সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের আন্দোলনের চেয়েও সংসদের ফ্লোরে বসে যুক্তি দিয়ে সরকারকে কুপোকাত করাই হলো আধুনিক রাজনীতির শ্রেষ্ঠ শিল্প। কক্ষত্যাগ করে মাঠ খালি করে দেওয়া মানে পরোক্ষভাবে জবাবদিহিতার সুযোগটি হারিয়ে ফেলা।শেষ কথা
সংসদ কোনো যুদ্ধের ময়দান নয়, বরং এটি হলো মেধা ও যুক্তির মিলনায়তন। ওয়াকআউটের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের এমন এক সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে স্পিকারের মাইক হবে নিরপেক্ষতার প্রতীক, আর প্রতিটি সংসদ সদস্যের কথা হবে জনগণের আর্তনাদ। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কেবল ভোটের সংখ্যায় নয়, বরং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার মধ্যেই বেঁচে থাকে। আমরা কি পারব সেই আধুনিক ও পরমতসহিষ্ণু রাজনীতির চর্চা করতে, যেখানে কেউ সংসদ ছেড়ে যাবে না, বরং সবাই মিলে সমাধানের পথ খুঁজবে?
দিনের শেষে, গণতন্ত্রের হার-জিত নির্ধারিত হয় সংসদের লবিতে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে। সংসদ যেন সেই উন্নয়নের পথে কোনো দেয়াল হয়ে না দাঁড়ায়।
আরও জানতে সাথে থাকুন...