
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের চরম উত্তেজনা ও সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোববার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে দেশ দুটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তিচুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, চুক্তির খসড়া নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন দুই পক্ষের কর্মকর্তাদের মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় ও গোপন আলোচনা হয়েছে। পশ্চিমা এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, চুক্তিটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও রয়টার্সের খসড়া প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এই সম্ভাব্য চুক্তিতে তেহরানের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নেওয়া হচ্ছে। খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত প্রধান বিষয়গুলো হলো:
১. আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত কঠোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে।
২. আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্তকরণ: আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানের শত শত কোটি ডলারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া হবে।
৩. আঞ্চলিক সংঘাত ও হামলা বন্ধ: লেবাননসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ফ্রন্টে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি খসড়ায় রয়েছে। এছাড়া জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, এর বিনিময়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানে সব ধরনের সামরিক হামলা বন্ধের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তাও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সমঝোতাটি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহন পথ 'হরমুজ প্রণালী' পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের জেরে এই রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চরম অস্থির হয়ে উঠেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা 'মেহর নিউজ'-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের জন্য অন্তত ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি বিশাল অর্থনৈতিক সহায়তা পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারে। এই তহবিল যুদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি অর্থনীতি পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি, ইরানের চারপাশে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে এই খসড়ায়। তবে এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক সহায়তার বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কৌশলগত কারণে এই চুক্তির প্রথম ধাপে ইরানের বহুল আলোচিত পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আলাদাভাবে আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। ওয়াশিংটন ও তার পশ্চিমা মিত্ররা দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করে আসছে যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না। তবে তেহরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে দাবি করে আসছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার চরম সংকটের মুখে এই সম্ভাব্য চুক্তিটি অত্যন্ত যুগান্তকারী। আলোচিত শর্তগুলোতে দুই পক্ষ শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়ে চুক্তি সই করলে, তা শুধু ওয়াশিংটন-তেহরান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফই গলাবে না, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করবে।
আরও জানতে চোখ রাখুন...