আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সুদীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক মহলের নজিরবিহীন ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি থাকা ইরান অবশেষে বিশ্ব অর্থনীতিতে পুনরায় যুক্ত হওয়ার একটি বড় সুযোগ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে দেশটির ওপর থেকে নানামুখী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা ইরানের বাণিজ্য ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে দীর্ঘ ১৬ সপ্তাহের একটি রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধের পর, দীর্ঘমেয়াদে ইরানের ভবিষ্যৎ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ‘একঘরে’ দশা থেকে ইরানের মুক্তি মিলতে যাচ্ছে, যার ফলে শীর্ষস্থানীয় এই তেল উৎপাদনকারী দেশ আবারও বিশ্বের বাকি অংশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে।
ট্রাম্প-পজেশকিয়ান চুক্তি ও ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পজেশকিয়ানের মধ্যে এই প্রাথমিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যদিও একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর পথটি অনেক প্রতিবন্ধকতায় ভরা, তবুও এই চুক্তি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য আঞ্চলিক অন্যান্য দেশগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি **৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল** গঠনে সম্মত হয়েছেন।
হরমুজ প্রণালী থেকে নতুন আয়ের উৎস
জ্বালানি খাতের অন্যতম পরাশক্তি এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’র তীরে অবস্থিত ইরান এখন সম্পূর্ণ নতুন একটি আয়ের উৎস তৈরি করতে যাচ্ছে। প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী হাজার হাজার মালবাহী কার্গো জাহাজ থেকে ইরান এখন শুল্ক বা অর্থ আদায় করতে পারবে। যুদ্ধ শুরুর আগে এমন একটি সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়, যা এখন মার্কিন-ইরান চুক্তির মাধ্যমে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা 'বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন'-এর প্রধান নির্বাহী এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিজ মন্তব্য করেছেন:
এটি সত্যিই একটি অসাধারণ দলিল। এই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, তার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।"
মিশ্র প্রতিক্রিয়া: মার্কিন রাজনীতি ও মিত্রদের ক্ষোভ
এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
জেডি ভ্যান্সের সাফাই:মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই চুক্তির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, পরবর্তী দফার আলোচনাগুলোতে নিজেদের শর্ত মানাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যথেষ্ট প্রভাব খাটানোর সুযোগ বা লিভারেজ রয়েছে। তবে তিনি ভুলভাবে দাবি করেছিলেন যে, তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় ইরান নতুন কোনো সুবিধা পায়নি।
ইসরায়েলের তীব্র ক্ষোভ:বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি ইসরায়েলের জন্য একটি বড় বিপর্যয়। কারণ এতে ইসরায়েলের একটি লক্ষ্যও পূরণ হয়নি, বরং উল্টো দেশটি আগের চেয়ে আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। ইসরায়েলের ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম ও শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই চুক্তির জন্য সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ও সমালোচনা করছেন।
আঞ্চলিক হতাশা: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর কর্মকর্তারা এই চুক্তি নিয়ে তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেছেন। কারণ, এই প্রাথমিক চুক্তিতে ইরানের বিতর্কিত মিসাইল (ক্ষেপণাস্ত্র) এবং ড্রোন কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো কোনো ধারা রাখা হয়নি।
ন্যাটো এবং মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ন্যাটো জোটের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের একটি বৈঠকে মিত্র দেশগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইরানের ওপর মার্কিন হামলায় সহায়তা করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অনিচ্ছার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করে হেগসেথ হুমকি দিয়েছেন যে, এর প্রতিক্রিয়ায় পেন্টাগন ইউরোপে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাসংখ্যা হ্রাস করতে পারে।
এছাড়া, যুদ্ধ চলাকালীন কয়েক মাস আগে ইরানের একটি স্কুলে মার্কিন বিমান হামলার বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা এখনো প্রকাশ্যে কোনো দায় স্বীকার বা মন্তব্য করেননি।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ ১৬ সপ্তাহের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে এই মার্কিন-ইরান চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
আরও জানতে চোখ রাখুন...