
মিলন বৈদ্য শুভ, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামে স্বামীর অতিরিক্ত লোভ, ফ্ল্যাট লিখে দেওয়ার জন্য চাপ এবং লাগাতার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন চট্টগ্রামের এক গৃহিণী। নিহত গৃহিণীর নাম আবিদা তাসমিন (৩২)। এ ঘটনায় তীব্র উত্তেজনার মাঝে স্থানীয়দের সহায়তায় অভিযুক্ত স্বামী সাইফুদ্দিন মাহমুদ মারুফ (৩৮)-কে দ্রুত গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (০২ অক্টোবর, ২০২৫) সন্ধ্যায় জিইসির মোড় সংলগ্ন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ইসমাইল টাওয়ারের (২য়) তলায় মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সাইফুদ্দিন মাহমুদ মারুফের সঙ্গে আবিদা তাসমিনের বিবাহ হয়। বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর তাদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক থাকলেও, পরবর্তীতে চিত্র পাল্টে যায়। ইসমাইল টাওয়ারের যে ফ্ল্যাটটিতে তারা বসবাস করতেন, সেটি ছিল আবিদা তাসমিনের নামে।
জানা গেছে, ফ্ল্যাটটি নিজের নামে লিখিয়ে নেওয়ার জন্য স্বামী মারুফ গত প্রায় দুই বছর ধরে তাসমিনের উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। তাসমিন এতে রাজি না হওয়ায়, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে নিয়মিত কথা কাটাকাটি, পারিবারিক কলহ লেগেই থাকত। অভিযোগ উঠেছে, মারুফ প্রায়শই তাসমিনকে মারধর করতেন এবং চরম মানসিক অত্যাচার চালাতেন। স্বামীর এমন আচরণে তাসমিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। তাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকিও দেওয়া হতো।
গত বৃহস্পতিবার (০২ অক্টোবর, ২০২৫) আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টার দিকে আবিদা তাসমিন তার স্বামী মারুফের সঙ্গে প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন। এর কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট থেকে ৭টা ৪০ মিনিটের মধ্যে প্রতিবেশীরা বিল্ডিংয়ের নিচ থেকে জোরে চিৎকার শুনতে পান। তারা দ্রুত নিচে গিয়ে দেখেন, আবিদা তাসমিন রক্তাক্ত অবস্থায় বিল্ডিংয়ের মূল গেটের সামনের রাস্তায় পড়ে আছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি নয়তলা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
তাৎক্ষণিকভাবে স্বামী সাইফুদ্দিন মাহমুদ মারুফ ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাসমিনকে প্রথমে চকবাজার থানাধীন মেট্রোপলিটন হাসপাতাল এবং পরে পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত ডাক্তার দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রাত ১০টার দিকে কর্তব্যরত ডাক্তার আবিদা তাসমিনকে মৃত ঘোষণা করেন। ডাক্তারের দেওয়া মৃত্যুর কারণের বিবরণে 'Brought in Dead/Fall from height' (আনার আগেই মৃত/উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া) উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হলে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে একটি চৌকস দল দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং ঘাতক স্বামী মারুফকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
এলাকার সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে দ্রুত এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করা হয়েছে। তাদের একটাই দাবি—আর কত মেয়েকে এমন লোভী স্বামীর কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে? জনগণের পক্ষ থেকে এই 'লোভী নরঘাতক পাষন্ড স্বামীকে' আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বর্তমানে অভিযুক্ত স্বামী সাইফুদ্দিন মাহমুদ মারুফ পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন এবং পুলিশ ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে।