রাজনীতির ইতিহাসে অনেক ত্যাগের গল্প থাকে, লড়াই-সংগ্রামের মহাকাব্য থাকে; কিন্তু প্রভুভক্তি আর বিশ্বস্ততার এমন নজির হয়তো পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। গত সাড়ে তিন দশক ধরে যিনি ছায়ার মতো পাশে ছিলেন, আজ তিনি বড় বেশি একা। গতকাল মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে যখন প্রিয় 'ম্যাডাম'কে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো, তখন লাখো মানুষের ভিড়েও ফাতেমা ছিলেন এক বিষাদমাখা নিঃসঙ্গ দ্বীপ। যে ভালোবাসা আর ত্যাগের মহিমায় তিনি খালেদা জিয়ার সেবা করেছেন, তা যেন যেকোনো ত্যাগের **'বিশ্ব রেকর্ড'**কেও হার মানায়।
এক জীবনের উৎসর্গ
১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, তখনই তার ব্যক্তিগত সেবিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন ফাতেমা। সেই থেকে শুরু করে গত ৩৪ বছর নিজের ব্যক্তিগত জীবন, সংসার কিংবা সুখ—সবই তিনি ম্যাডামের চরণে 'উৎসর্গ' করে দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার দুই ছেলে প্রবাসে থাকায় এবং স্বামী অকালপ্রয়াত হওয়ায়, ফাতেমাই ছিলেন তার নিত্যদিনের একমাত্র ভরসা ও পরম স্বজন।
কারাগারের দেয়ালও সরাতে পারেনি
২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি যখন খালেদা জিয়া কারাবন্দী হন, তখন লোহার গরাদ কিংবা কারাগারের উঁচু দেয়াল—কোনো কিছুই ম্যাডামের পাশ থেকে সরাতে পারেনি ফাতেমাকে। আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে এটি এক বিস্ময়কর ঘটনা। আদালতের বিশেষ অনুমতি নিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছিলেন কেবল ম্যাডামের সেবা করার জন্য। এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আনুগত্য আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
বিশ্ব ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রনায়কের প্রতি এমন নিবিড় আনুগত্যের ঘটনা খুব কমই আছে। ফাতেমার এই ত্যাগ মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসের আরও কিছু বিরল দৃষ্টান্ত:
* মহাত্মা গান্ধী ও মহাদেব দেশাই: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা মহাত্মা গান্ধীর ব্যক্তিগত সচিব মহাদেব দেশাই দীর্ঘ ২৫ বছর ছায়ার মতো তাঁর সাথে ছিলেন। আগা খান প্রাসাদে গান্ধী যখন কারাবন্দী হন, মহাদেবও তাঁর সাথে কারাবরণ করেন এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
* নেলসন ম্যান্ডেলা ও তাঁর সহকারীরা: বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাজীবনে এবং পরবর্তী জীবনে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীরা পরিবারের সদস্যদের চেয়েও বেশি বিশ্বস্ত ছিলেন।
* উইনস্টন চার্চিল ও এলিজাবেথ নেল: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের ব্যক্তিগত সচিব এলিজাবেথ নেল যেভাবে বোমাবর্ষণের মধ্যেও তাঁর পাশে থেকে কাজ করে গেছেন, তা ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে।
কিন্তু ফাতেমার বিষয়টি আলাদা; তিনি কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক সচিব ছিলেন না। তিনি ছিলেন সাধারণ এক সেবিকা, যিনি গত ৩৪ বছর নিজের পৃথিবী বলতে শুধু একজন মানুষকেই চিনেছেন। বিশ্বের আর কোনো প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ আর দেখা যায় না।
ফাতেমা আজ কাকে দেবেন সঙ্গ?
দাফন শেষে সবাই ফিরে গেছেন আপন গন্তব্যে, কিন্তু ফাতেমা ফিরবেন কোথায়? যার সকাল শুরু হতো ম্যাডামের মুখ দেখে, আর রাত ফুরোত তাঁর শিয়রে বসে থেকে, সেই ফাতেমা আজ কাকে দেবেন সঙ্গ? দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের স্মৃতি নিয়ে তিনি এখন কোথায় দাঁড়াবেন?
রাজনীতির 'আপসহীন নেত্রী' পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে, আর পেছনে ফেলে গেছেন এক জীবন উৎসর্গ করা ছায়াসঙ্গীকে, যার পৃথিবীটা আজ কেবলই স্মৃতির দীর্ঘশ্বাসে ঘেরা।
আরও পড়ুন.....