নোয়াখালী প্রতিনিধি:
ঘুরেফিরে নিজ জেলাতেই চাকরি করছেন দীর্ঘ ৩৭ বছর। এক জেলাতেই কাটিয়ে দিলেন কর্মজীবনের প্রায় পুরোটা সময়। তিনি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তা (ফরেস্টার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, উপজেলা এসএফপিসি) এ এস এম সামছুদ্দিন আহমেদ. এলাকায় তিনি এখন পরিচিত ‘বন সামছু’ নামে। একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও অনিয়ম, দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। কয়েক কোটি টাকার জমি, প্লট, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে সরকারি খাল দখল— কী নেই তার এই সাম্রাজ্যে!
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯০ সাল থেকে নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত আছেন সামছুদ্দিন। সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় চাকরির বিধান না থাকলেও সামছুদ্দিনের বেলায় নিয়ম যেন সম্পূর্ণ উল্টো। বর্তমানে তিনি বেগমগঞ্জের পাশাপাশি সোনাইমুড়ী ও সেনবাগ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
একজন উপজেলা বন কর্মকর্তার মাসিক বেতন সর্বসাকুল্যে ৩০ থেকে ৩৭ হাজার টাকা। অথচ এই আয়েই তিনি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার ভাটান্দা ইউনিয়নের কালিকাপুরে পৈতৃক ভিটার পাশাপাশি কিনেছেন ২২ ডিসিম জমি। বগাদিয়া-কালিকাপুর বাজার সংলগ্ন সড়কের পাশে কিনেছেন আরও প্রায় ৩০ ডিসিম জমি, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। এছাড়া রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের 'সুবাস্তু নজরভ্যালী'তে ১২৮০ বর্গফুটের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট এবং বেগমগঞ্জ আলীপুরের 'ফেমাস ভিউ আপন নিবাস-২' এ রয়েছে তার নামে আলিশান ফ্ল্যাট।
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রগঞ্জ সড়কের পাশের বনায়নের গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে অর্থ হরিলুট করেছেন তিনি। এছাড়া বেগমগঞ্জের আটিয়া বাড়ীর পৌল এলাকায় টেন্ডার ছাড়াই বনায়নের গাছ বিক্রি, বিনামূল্যে বিতরণের চারা বাজারে বিক্রি এবং বনায়নের উপকারভোগীদের ভাতা বেনামে নিজে ভোগ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় করাত মিলগুলোও তার হাত থেকে রেহাই পায়নি; প্রতিটি মিল থেকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে বছরে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
নিজের অপকর্ম আড়াল করতে সামাজিক বনায়নের কমিটিতে তিনি যুক্ত করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। শুধু তাই নয়, নিজের মানসিক প্রতিবন্ধী ভাইকে উপজেলা বন অফিসের নৌকাচালক হিসেবে ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে বেতন তুলছেন তিনি নিজেই। এছাড়া নিজ এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি জোরপূর্বক রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তা এ এস এম সামছুদ্দিন আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব না দিয়ে এড়িয়ে যান এবং বলেন, “একদিন অফিসে আসেন, চা-নাস্তার দাওয়াত রইলো।”
এ বিষয়ে নোয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোল্লা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান অনিয়ম, দুর্নীতি ও অফিস না করে বেতন উত্তোলনের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “এই বিষয়ে আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
আরও জানতে চোখ রাখুন...