বিশেষ প্রতিনিধি, নোয়াখালী: নোয়াখালী জেলায় মাদক বিরোধী অভিযান, অপরাধ দমন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। তবে পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় যানবাহন এবং নিজস্ব ভবনের অভাবসহ একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে বেগ পেতে হচ্ছে সংস্থাটিকে।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত নোয়াখালী জেলায় ৮৬৬টি অভিযান চালিয়ে ৬৭টি নিয়মিত মামলা ও ২০৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ২১২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে ৬৭,৫৫৫ পিস ইয়াবা, ৮৮.৬২০ কেজি গাঁজা, ২টি গাঁজা গাছ, ১ লিটার চোলাই মদ, ১০ বোতল বিদেশী মদ, বিভিন্ন পরিবহন (সিএনজি, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, অটোরিক্সা), ৫৫টি মোবাইল এবং নগদ ৩,৫৬,৮৮০ টাকা।
অভিযানের তথ্য চিত্র: নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১,৯৪২টি অভিযানে ২৯১টি মামলা এবং ৩১২ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালে ১,৬৫৫টি অভিযানে ১৭৫টি মামলা এবং ২০২৩ সালে ২,০২২টি অভিযানে ২৩৬টি মামলা দায়ের করা হয়।
অন্যান্য কার্যক্রম ও তল্লাশি: চলতি বছর (আগস্ট পর্যন্ত) মাদকপ্রবণ ও হটস্পটগুলোতে ৪০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে ১২৯০টি যানবাহন তল্লাশি করা হয়। এতে ১৭টি মামলায় ২২ জন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার এবং ৫৬,৩৫৭ পিস ইয়াবা ও ৩ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ৩৫টি যৌথ অভিযানে ১১ জন পাচারকারী গ্রেপ্তার এবং ৩,৫টি টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানে ১৩৫ জন সেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধি: মাদকবিরোধী প্রচারণায় শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম চালনা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১২টি আলোচনা সভা, ৭টি সেমিনার, ২৪টি পথসভা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক খাতা, কলম, স্কেলসহ সচেতনতামূলক লিফলেট, পোস্টার ও স্টিকার বিতরণ করা হয়েছে।
আদালতে মামলার অবস্থা ও নিরাময় কেন্দ্রের অভাব: বিজ্ঞ আদালতে নোয়াখালী জেলার মোট ১০৯৩টি মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে (দায়রা জজ আদালতে ৩৫৭টি এবং ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৭৩৬টি)। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলন্ত রয়েছে ২৬৬টি মামলা।
অন্যদিকে, নোয়াখালী জেলায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র নেই। ফলে ২০২৫-২০২৬ সালে চিহ্নিত ২২ জন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের নিরাময় কেন্দ্রে প্রেরণ করতে হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও প্রধান চ্যালেঞ্জ: ডিএনসি নোয়াখালী কার্যালয়ে বর্তমানে মঞ্জুরীকৃত ৩১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৫ জন এবং ৬টি পদ শূন্য রয়েছে (যার মধ্যে সহকারী পরিচালক ও সহকারী প্রসিকিউটর পদও রয়েছে)। কার্যালয়ের অপারেশন শাখায় কোনো নারী সদস্য নেই।
এছাড়া নিজস্ব ভবন না থাকা, জেলাজুড়ে অভিযান চালনার জন্য মাত্র ১টি যানবাহন থাকা, পর্যাপ্ত অস্ত্র ও আধুনিক সরঞ্জামের ঘাটতি এবং চরাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ মাদক নির্মূলে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক মাদক বেচাকেনা, সীমান্ত অতিক্রম করে আসা শক্তিশালী পাচারকারী নেটওয়ার্ক এবং তরুণদের বেকারত্ব ও অসচেতনতাও চ্যালেঞ্জকে আরো জটিল করে তুলছে।
অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, আধুনিক লজিস্টিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে নোয়াখালীতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও বেশি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
আরও জানতে চোখ রাখুন...