মো.রিয়াজুল সোহাগ, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন সেবায় দীর্ঘদিনের জট কাটাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সারা দেশে চালু করেছে বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত চলবে এই বিশেষ উদ্যোগ, যার লক্ষ্য—স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি, নাগরিক ভোগান্তি কমানো এবং সেবার গতি দ্বিগুণ করা।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক মো. আব্দুল হালিম খান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। আদেশ অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত ক্ষমতা, যা এতদিন আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের হাতে সীমাবদ্ধ ছিল।
ধীরগতির অভিযোগে নড়েচড়ে বসলো ইসি
ইসির একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এনআইডি সংশোধন সেবায় ধীরগতি, ফাইল জট, নথি যাচাইয়ের দীর্ঘসূত্রতা এবং অনলাইন আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব নিয়ে সাধারণ মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ বাড়ছিল।
অনেকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও সংশোধনকৃত এনআইডি হাতে পাচ্ছিলেন না।
এই জনদুর্ভোগ কমাতেই পুরো প্রক্রিয়াকে ‘এমার্জেন্সি মোডে’ নিয়ে এসেছে নির্বাচন কমিশন।
জেলা কর্মকর্তাদের হাতে বড় ক্ষমতা
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে— ‘গ’ ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা এখন থেকে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের হাতে।
আগে এ ধরনের জটিল আবেদন নিষ্পত্তি কেবল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হতো, ফলে সময় লাগতো বেশি। এখন জেলা পর্যায়েই সিদ্ধান্ত হওয়ায় প্রক্রিয়া হবে দ্রুত।
‘গ’ ক্যাটাগরির আবেদন কী?
বয়স সংশোধন (২ বছরের বেশি পার্থক্য)
জটিল তথ্য পরিবর্তন
নথি যাচাই ও বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন এমন আবেদন
এই ক্ষমতা জেলা পর্যায়ে পৌঁছানোয় সাধারণ নাগরিকের অপেক্ষার সময় অর্ধেকে নেমে আসবে বলে আশা করছে ইসি।
বহুল ব্যস্ত অঞ্চলে বাড়তি জনবল
ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে এনআইডি সংশোধনের চাপ সবচেয়ে বেশি। এজন্য এসব অঞ্চলে নেওয়া হয়েছে বিশেষ পদক্ষেপ—
সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত কর্মকর্তা যুক্ত
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কর্মকর্তাদেরও মাঠে নামানো
প্রতিদিন বাড়তি সময় কাজ করার নির্দেশ
যেসব অফিসে লাইনে দাঁড়িয়ে ভিড় হয়, সেখানে অতিরিক্ত কাউন্টার খোলার নির্দেশ
যেভাবে চলবে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’
ইসি ৩০ জুন পর্যন্ত যে বিশেষ উদ্যোগ চালাচ্ছে তার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
অনলাইন আবেদন যাচাই দ্রুত শেষ করা
অনলাইন আবেদন জমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তথ্য যাচাই ও নথি স্ক্রিনিং করা হবে।
সরল নথির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক অনুমোদন
যেসব সংশোধনে অতিরিক্ত যাচাইয়ের দরকার নেই, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি।
মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরেজমিন যাচাই
যে ক্ষেত্রে নথি অস্পষ্ট বা তথ্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সেখানে দ্রুত মাঠ পর্যায়ের যাচাই দল কাজ করবে।
প্রতিদিন অতিরিক্ত সময় কাজের নির্দেশনা
জেলা অফিসগুলোতে সকাল থেকে শেষ কর্মঘণ্টা পর্যন্ত ব্যস্ত সময়জুড়ে কর্মকর্তারা থাকবেন।জটিল আবেদনে বিশেষ ডেস্ক যেসব আবেদনে বয়স, নাম বা পরিবারিক সম্পর্ক জটিলতা আছে, সেগুলোর জন্য আলাদা ডেস্কে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা কাজ করবেন।
নাগরিক সুবিধা বাড়বে—বিশেষজ্ঞদের মত
ইসি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালুর ফলে—
আবেদন জট কমবে
মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা থেকে মুক্তি পাবে
নাম, বয়স ও ঠিকানা ভুল সংশোধনে সময় কম লাগবে
নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা বাড়বে
একজন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জানান,
“আগে যেসব আবেদন আঞ্চলিক দপ্তরে পাঠাতে হতো, এখন এখানেই সমাধান করতে পারছি। এতে সময় কমছে, সেবা বাড়ছে।”
এনআইডি সংশোধনে নাগরিকদের করণীয়
ইসি জানিয়েছে, নাগরিকরা নিচের নথি প্রস্তুত রাখলে সংশোধন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব—
জন্ম নিবন্ধন সনদ
শিক্ষাগত সনদ (প্রয়োজনে)
পিতামাতা বা স্বামী/স্ত্রীর এনআইডি
ঠিকানার প্রমাণ
সংশোধনযোগ্য তথ্যের যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা
সেবার গতি বাড়াতে নির্বাচন কমিশনের এই বিশেষ উদ্যোগ দেশের নাগরিকদের জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা। বছরজুড়ে জটিল সেবার যন্ত্রণা ভোগ করা মানুষ অবশেষে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।